নবজাতকের চোখ বা শরীর সামান্য হলুদ দেখামাত্রই কি কড়া রোদে ফেলে রাখছেন?
সাবধান! সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মির এই তীব্র প্রলেপ আপনার অবুজ বাচ্চার নরম চামড়া ও চোখকে চিরতরে পুড়িয়ে দিচ্ছে না তো?
বিশেষজ্ঞ অভিমত
নবজাতকের জন্মের প্রথম সপ্তাহে জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা ছাড়া বাচ্চার শরীরে কড়া রোদ লাগানো কিংবা ওটিসি কোনো কেমিক্যাল ড্রপ খাওয়ানো এক মারাত্মক ভুল; কারণ রক্তের অতিরিক্ত বিলিরুবিন বাচ্চার মস্তিস্কে বিষক্রিয়া তৈরি করে চিরতরে স্নায়ু বিকল করে দিতে পারে।
আমাদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা এনআইসিইউ (NICU) বিভাগে প্রায়ই এমন অনেক আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা শিশু আসে, যাদের জন্মের ২-৩ দিনের মধ্যে শরীর বা চোখ সামান্য হলুদ দেখামাত্রই পরিবারের মুরুব্বিরা চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে সকালের কড়া রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুইয়ে রেখেছিলেন। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি অত্যন্ত গভীর ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত একটি ভয়ানক ক্ষতিকর অবৈজ্ঞানিক শর্টকাট প্র্যাকটিস। অনেকেই ভাবেন রোদ দিলেই বাচ্চার জন্ডিস প্রাকৃতিকভাবে সম্পূর্ণ গলে যায়, তাই হাসপাতালে গিয়ে টাকা ও সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিখুঁত পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি ও মেটাবলিক অ্যানাটমি অনুযায়ী, নবজাতকের জন্মের পর রক্তের অতিরিক্ত লোহিত কণিকা ভাঙার ফলে লিভারে 'বিলিরুবিন' (Bilirubin) নামক এক হলুদ রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি হয়। বাচ্চার কাঁচা যকৃত বা লিভার এই বিলিরুবিন রক্ত থেকে পুরোপুরি ছেঁকে পরিষ্কার করতে না পারায় তা চামড়ায় জমা হয়ে সাধারণ ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের রূপ নেয়।
আপনি যখন কোনো বিশেষজ্ঞের সুনির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষা (Serum Bilirubin) ছাড়া বাচ্চার অবুজ শরীরকে কড়া রোদের নিচে ফেলে রাখবেন, তখন সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনী (UV) রশ্মি শিশুর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পাতলা চামড়াকে অ্যাসিডের মতো পুড়িয়ে তীব্র ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার জন্ম দেয় এবং বাচ্চার চোখের কর্নিয়াকে স্থায়ীভাবে ড্যামেজ করে দেয়। এর চেয়েও বিপজ্জনক চিকিৎসাগত সত্য হলো, রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা যদি ১৫ থেকে ২০ মিলিগ্রামের ওপরে চলে যায়, তবে সেই টক্সিক উপাদান বাচ্চার নরম মস্তিস্কের সুরক্ষাপ্রাচীর (Blood-Brain Barrier) এক সেকেন্ডে ভেদ করে ফেলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে 'কার্নিকটেরাস' (Kernicterus) বলা হয়, যা অবুজ শিশুর মস্তিস্কের স্নায়ু কোষগুলোকে সরাসরি পুড়িয়ে চিরতরে অকেজো করে দেয়। এর ফলে বাচ্চা তীব্র খিঁচুনি, অন্ধত্ব, বধিরতা এবং আজীবনের জন্য মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়, যা কোনো কড়া কেমিক্যাল থেরাপিতেও আর ভালো করা অসম্ভব।
নবজাতকের জন্ডিস ও স্নায়ুর সুরক্ষার আসল বৈজ্ঞানিক সমাধান লুকিয়ে আছে কোনো ওটিসি ড্রপ বা রোদের ভুয়া টোটকার পেছনে গোল্ডেন সময় নষ্ট না করে প্রথম দিন থেকেই বাচ্চার ফিডিং ফ্রিকোয়েন্সি বা দুধ পানের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ভেতর। মায়ের বুকের দুধের তরল উপাদান বিলিরুবিনকে প্রাকৃতিকভাবেই মলমূত্রের মাধ্যমে বাচ্চার শরীর থেকে ধুয়ে বা ফ্ল্যাশ আউট করে পরিষ্কার করে দেয়; তাই প্রতি ২ ঘণ্টা পর পর বাচ্চাকে নিবিড়ভাবে বুকের দুধ খাওয়ান। কোনো ওটিসি ড্রাগসের মোহের পেছনে সময় নষ্ট না করে একজন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞের অধীনে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে বাচ্চার জন্ডিসের আসল মাত্রা নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করুন। যদি বিলিরুবিনের মাত্রা বিপজ্জনক সীমায় থাকে, তবে অবহেলা না করে হাসপাতালের এনআইসিইউতে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ 'ফটোথেরাপি' (Phototherapy) নীল আলোর উন্নত প্রফেশনাল চিকিৎসা নিশ্চিত করুন, যা বাচ্চার নরম কোষের বিন্দুমাত্র ক্ষতি না করে জন্ডিসকে সম্পূর্ণ মূত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়।
এই মতামত আপনার কোন বাস্তবতার সাথে মিলে গেছে?
এই লেখাটি ০ জন ভিজিটরের বাস্তবতার সাথে মিলে গেছে।
আপনার মতামত বা প্রশ্ন
সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়
প্রথম সন্তানের জন্ডিসে রোদ দিয়েছিলাম, বিলিরুবিন বেড়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় সন্তানে ফটোথেরাপি করিয়ে সুস্থ হয়েছে।
ছেলের জন্ডিস দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বললেন বুকের দুধ বাড়ানো আর ফটোথেরাপিই আসল সমাধান।
গ্রামে সবাই বলে রোদে রাখতে। কিন্তু ডাক্তার নিষেধ করলেন। ফটোথেরাপি করিয়ে বাঁচিয়েছি।
প্রিমিয়ামে আপগ্রেড করুন
১৫+ বিশেষজ্ঞের ৫০০+ মতামত ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ঝুঁকি মূল্যায়ন পান।
আজই যোগ দিন
AI-চালিত স্বাস্থ্য লকার ও ব্যক্তিগতকৃত স্বাস্থ্য পরিকল্পনা পান।
