জন্মের পর পরই কি শিশুকে শালদুধ না দিয়ে মুখে মধু বা কৌটার ফর্মুলা দুধ দিচ্ছেন?
সাবধান! অবৈজ্ঞানিক ও চটকদার কমার্শিয়াল মিল্কের এই ভুল প্র্যাকটিস আপনার অবুজ সন্তানের অন্ত্র ও ইমিউনিটিকে চিরতরে ধ্বংস করছে না তো?
বিশেষজ্ঞ অভিমত
জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শিশুকে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া এক ফোঁটা পানি, মধু বা বাজারের কৃত্রিম কৌটার ফর্মুলা দুধ খাওয়ানো এক মারাত্মক চিকিৎসাগত অপরাধ; কারণ এই কৃত্রিম রাসায়নিক শিশুর সংবেদনশীল অন্ত্রকে ক্ষতবিক্ষত করে ডায়রিয়া ও স্থায়ী অপুষ্টির জন্ম দেয়।
আমাদের শিশু স্বাস্থ্য ও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে প্রতিদিন এমন অনেক মারাত্মক ডায়রিয়া, তীব্র পেট ফাঁপা এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত নবজাতক বা ইনফ্যান্ট শিশু আসে, যাদের মায়েরা বা ঠাকুমারা শিশুর কান্নার দোহাই দিয়ে জন্মের প্রথম দিন থেকেই ওটিসি (OTC) কৌটার দুধ বা ইনফ্যান্ট ফর্মুলা ফিডিং করাতে শুরু করেছেন। আমাদের দেশের গ্রামীণ ও শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এটি অত্যন্ত গভীর ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত একটি ভয়ানক ক্ষতিকর অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কার। অনেকেই ভাবেন জন্মের পর প্রথম ২-৩ দিন মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ আসে না, তাই শিশু ক্ষুধার্ত থেকে শুকিয়ে যাবে; এই আতঙ্কে তারা বাচ্চার মুখে সস্তা ডিব্বার কেমিক্যাল গুঁড়ো দুধ বা ড্রপার দিয়ে মধুর রস তুলে দেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিখুঁত পেডিয়াট্রিক ফিজিওলজি ও মেটাবলিক অ্যানাটমি অনুযায়ী, জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন মায়ের স্তন থেকে যে ঘন আঠালো হলুদ রঙের 'শালদুধ' বা কোলস্ট্রাম (Colostrum) নিঃসৃত হয়, তা পরিমাণে অত্যন্ত কম হলেও একটি নবজাতকের ছোট্ট পাকস্থলীর জন্য শতভাগ পর্যাপ্ত। এই শালদুধ মূলত শিশুর জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী কুদরতি ওষধি টিকা, যা উচ্চমাত্রার ইমিউনোগ্লোবুলিন (IgA) ও শ্বেতকণিকা সমৃদ্ধ এবং বাচ্চার ভেতরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দেয়ালের মতো পাহারা দেয়।
আপনি যখন কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের লিখিত নির্দেশনা ও পরীক্ষা ছাড়া শিশুকে কমার্শিয়াল ফর্মুলা মিল্ক বা ডিব্বার কেমিক্যাল ককটেল খাওয়াবেন, তখন সেই ভারী গরুর দুধের ক্যাসিন প্রোটিন ও প্রক্রিয়াজাত সোডিয়াম প্রসেস করার ক্ষমতা বাচ্চার কাঁচা পরিপাকতন্ত্রের বিন্দুমাত্র থাকে না। এর সরাসরি ফলে, শিশুর অন্ত্রের উপরিভাগের অত্যন্ত নরম মিউকাস আস্তরণটি অ্যাসিডের মতো পুড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে 'অ্যালার্জিক এন্টেরোপ্যাথি' বলা হয়, যা এক নিমেষে তীব্র অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়রিয়া, বমি এবং মারাত্মক ইনফেকশনের জন্ম দেয়। তাছাড়া, মধুর কড়া ব্যাকটেরিয়াল স্পোর নবজাতকের মস্তিস্ক ও স্নায়ুকে অবশ করে 'ইনফ্যান্ট বোটুলিজম' নামক এক চূড়ান্ত জীবনঘাতী চিকিৎসাগত সংকট তৈরি করতে পারে।
শিশুর অন্ত্রের সুরক্ষা এবং নিউট্রিশন স্বাভাবিক রাখার একমাত্র আসল বৈজ্ঞানিক নিরাময় লুকিয়ে আছে প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধের ওপর বাচ্চার একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কোনো চটকদার কোম্পানির বিজ্ঞাপনের মোহে বা মুরুব্বিদের অবৈজ্ঞানিক টোটকার পেছনে অবুজ সন্তানের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না। মায়ের বুকের দুধে শতকরা ৮৮ ভাগই বিশুদ্ধ পানি থাকে; তাই প্রথম ৬ মাস বাচ্চাকে বাইরে থেকে আলাদা এক ফোঁটা পানি বা ওটিসি ওরাল গ্লুকোজ দেওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। ওষধি পুষ্টি নিশ্চিত করতে মায়ের খাবার তালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, তরল দুধ, শাকসবজি ও দেশী ছোট মাছ রাখুন, যা মায়ের বুকে দুধের প্রবাহ প্রাকৃতিকভাবেই বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। শরীর হাইড্রেটেড রাখতে এবং কোলাজেন টিস্যু সচল রাখতে প্রসূতি মা নিজে দৈনিক অন্তত ৩.৫ লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করা বাধ্যতামূলক করুন। শিশু যদি অনবরত কান্নাকাটি করে বা প্রসবের পর মায়ের দুধ আসতে দেরি হয়, তবে নিজে নিজে কৌটার দুধের বোতল বাচ্চার মুখে না দিয়ে অবিলম্বে একজন প্রফেশনাল ল্যাকটেশন কনসালটেন্ট বা শিশু রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।
এই মতামত আপনার কোন বাস্তবতার সাথে মিলে গেছে?
এই লেখাটি ০ জন ভিজিটরের বাস্তবতার সাথে মিলে গেছে।
আপনার মতামত বা প্রশ্ন
সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়
প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর কৌটার দুধ খাওয়িয়েছিলাম। ডায়রিয়া লেগেই থাকত। দ্বিতীয় বাচ্চায় শুধু বুকের দুধ দিয়েছি, কোনো সমস্যা হয়নি।
শাশুড়ি বললেন মধু খাওয়াতে, শিশুর অসুখ হলো। ডাক্তার বললেন বোটুলিজমের ঝুঁকি ছিল। সবার উচিত জানা।
মেয়ের জন্মে শালদুধের গুরুত্ব বুঝিনি। পরে ডাক্তার বুঝিয়ে বললেন। এখন ৬ মাস শুধু বুকের দুধ দিয়েছি।
প্রিমিয়ামে আপগ্রেড করুন
১৫+ বিশেষজ্ঞের ৫০০+ মতামত ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ঝুঁকি মূল্যায়ন পান।
আজই যোগ দিন
AI-চালিত স্বাস্থ্য লকার ও ব্যক্তিগতকৃত স্বাস্থ্য পরিকল্পনা পান।
