ফার্স্ট এইড ও জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা

গলায় মাছের কাঁটা বিঁধলে তা বের করার ১০টি সহজ উপায়

ব্লগ এডমিন

মেডিকেল কনটেন্ট রাইটার

মেডিকেল প্যানেল দ্বারা সত্যায়িত
৫ মিনিট পড়ার সময়

মাছে-ভাতে বাঙালি হিসেবে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় মাছ থাকবে না, তা যেন ভাবাই যায় না। তবে মাছ খাওয়ার এই আনন্দের মাঝে একটি অতি সাধারণ, আকস্মিক এবং চরম অস্বস্তিকর যে দুর্ঘটনাটি ঘটে, তা হলো গলায় মাছের কাঁটা বিঁধে যাওয়া (Fish Bone Stuck in Throat)। কাঁটা বিঁধলে গলার ভেতর এক তীব্র খসখসে অনুভূতি, ঢোক গিলতে গেলে সুচের মতো বিঁধতে থাকা ব্যথা এবং অনবরত এক যন্ত্রণাদায়ক অস্বস্তি মা ও শিশুদের এক নিমেষেই প্যানিকড বা আতঙ্কিত করে তোলে। এই প্রারম্ভিক সময়ে সঠিক ফার্স্ট এইড জানা না থাকলে এবং ভুল পদ্ধতিতে চেষ্টা করলে গলার নরম টিস্যু বা খাদ্যনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আমাদের দেশে অনেক পরিবারেই গলায় কাঁটা বিঁধলে প্যানিকড হয়ে লোকমুখে শুনে কোনো কাটছাঁট ছাড়া শুকনো ভাতের বড় বড় দলা শক্তভাবে গিলে খাওয়া বা নখ দিয়ে গলার ভেতর জোরপূর্বক হাতড়ানোর মতো মারাত্মক ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, অতিরিক্ত শক্ত শুকনো ভাতের দলা জোরে গিলে খেলে তা আটকে থাকা সূক্ষ্ম কাঁটাটিকে গলার নরম মাংসের আরও গভীরে ঢুকিয়ে দিতে পারে অথবা খাদ্যনালীর আস্তরণ ছিঁড়ে রক্তক্ষরণের (Tissue Tear) সৃষ্টি করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, বেশিরভাগ সাধারণ নরম কাঁটা কোনো কড়া কেমিক্যাল বা অপারেশনের ধকল ছাড়াই রান্নাঘরের সহজ কিছু পিচ্ছিল ও তরল উপাদান এবং সঠিক ফার্স্ট এইড নিয়ম মেনে প্রাকৃতিকভাবেই নিচের পেটে নামিয়ে দেওয়া সম্ভব। আজ আমরা গলায় মাছের কাঁটা বিঁধলে তা বের করার ১০টি নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক ঘরোয়া উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

মাছের কাঁটার প্রকারভেদ ও বিঁধে যাওয়ার ধরন

বাংলাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন মাছের কাঁটার আকার, ধারালো ভাব ও গঠন আলাদা। কাঁটার ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতিও ভিন্ন হয়:

  • নরম ও পাতলা কাঁটা (Fine Bones): রুই, কাতলা বা মৃগেল মাছের ছোট ও পাতলা কাঁটাগুলো সাধারণত গলার উপরিভাগে হালকাভাবে আটকে যায় এবং ঘরোয়া উপায়ে সহজেই নামিয়ে আনা যায়।
  • শক্ত ও মোটা কাঁটা (Rigid Bones): চিতল, বোয়াল বা পাঙাশ মাছের বড় ও শক্ত কাঁটা গলার মাংসে গভীরে বিঁধতে পারে এবং এগুলো ঘরোয়া পদ্ধতিতে না উঠলে ENT বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন।
  • সূক্ষ্ম কাঁটার টুকরো (Fish Bone Splinters): শুঁটকি বা ছোট মলা মাছের অতি সূক্ষ্ম কাঁটা গলার লালায় আটকে তীব্র খসখসে অনুভূতি সৃষ্টি করে, যা পানি পান করলেই অনেক সময় চলে যায়।
  • খাদ্যনালীতে আটকে যাওয়া (Esophageal Impaction): বড় কাঁটা ভুল করে গিলে ফেললে তা খাদ্যনালীতে আটকে রক্তক্ষরণ বা ছিদ্র করতে পারে—এটি একটি জরুরি চিকিৎসা বিষয়।

গলায় মাছের কাঁটা বিঁধলে তা বের করার ১০টি কার্যকরী ঘরোয়া উপায়

গলার কোনো ক্ষতি না করে এবং সেলাই বা পেশীর ধকল ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে কষা কাঁটাটি নিচে নামিয়ে দিতে নিচের ১০টি পদ্ধতি তাৎক্ষণিকভাবে ও ধাপে ধাপে অনুসরণ করুন:

১. জোরপূর্বক শুকনো ভাতের দলা বর্জন ও নরম ভাতের মণ্ড ব্যবহার

গভীরে বিঁধে থাকা কাঁটা নামাতে অতিরিক্ত শক্ত শুকনো ভাতের দলা জোর করে গিলে খাওয়া সম্পূর্ণ বর্জন করুন। এর বদলে সাধারণ নরম সাদা ভাত সামান্য পানি দিয়ে একটু আঠালো বা নরম মণ্ড বানিয়ে নিন। এবার ছোট আকারের একটি নরম ভাতের বল বা মণ্ড তৈরি করে পানি ছাড়া এক টানে গিলে ফেলার চেষ্টা করুন। নরম ভাতের আঠালো ভাব অনেক সময় গলার দেওয়ালে আটকে থাকা কাঁটাটিকে নিজের সাথে পেঁচিয়ে পেটের দিকে টেনে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

২. পাকা কলার পিচ্ছিল ওষধি ব্যবহার (Banana)

পাকা কলা গলায় আটকে থাকা কাঁটা দূর করার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত অন্যতম সেরা ও চমৎকার একটি ঘরোয়া পথ্য। কলার ভেতরের অংশ প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত ঘন এবং পিচ্ছিল প্রকৃতির হয়। গলায় কাঁটা বিঁধলে একটি পাকা কলার বড় এক টুকরো মুখে নিয়ে চিবানো ছাড়াই আলতো করে এক টানে গিলে ফেলার চেষ্টা করুন। কলার এই পিচ্ছিল ও ভারী দেয়াল গলার কাঁটাটিকে খুব নিরাপদে নিজের সাথে আটকে টেনে পাকস্থলীর দিকে নামিয়ে দেয়।

৩. লিকুইড ময়েশ্চারাইজার হিসেবে খাঁটি অলিভ অয়েলের সেবন

যদি ভাতের মণ্ড বা কলার পদ্ধতি কাজ না করে, তবে রান্নাঘরের খাঁটি অলিভ অয়েল (Olive Oil) বা সরিষার তেল ব্যবহার করতে পারেন। তেল প্রাকৃতিকভাবেই একটি চমত্কার লুব্রিকেন্ট বা পিচ্ছিলকারী উপাদান। গলায় কাঁটা বিঁধলে ১ থেকে ২ চামচ খাঁটি অলিভ অয়েল সরাসরি গিলে পান করুন। তেলটি আপনার গলার ভেতরের আস্তরণ এবং আটকে থাকা কাঁটাটিকে পিচ্ছিল করে দেবে, যার ফলে পরবর্তী বার ঢোক গিললে বা পানি পান করলে কাঁটাটি সহজেই পিছলে নিচে নেমে যাবে।

৪. হালকা কুসুম গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে পান করা

এক গ্লাস হালকা কুসুম গরম পানিতে এক চিমটি লবণের মিশ্রণ তৈরি করে খুব ধীরে ধীরে পান করুন। গরম লবণ পানি গলার ভেতরের সংকুচিত পেশীগুলোকে আলতো করে শিথিল (Relax) করে দেয়। এর ফলে গলার রক্তনালী ও মাংসের দেয়াল নমনীয় হয়, যা আটকে থাকা কাঁটাটিকে তার জায়গা থেকে আলগা হতে সাহায্য করে। তাছাড়া লবণ পানির অ্যান্টি-সেপ্টিক গুণ কাঁটা লাগা থেকে হওয়া গলার ভেতরের ক্ষত ও লালচে ভাব দ্রুত উপশম করে।

৫. পাতিলেবুর রস ও সাইট্রিক এসিডের কার্যকারিতা

পাতিলেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক সাইট্রিক এসিড ও ভিটামিন সি। লেবুর এই তীব্র অম্লীয় বা এসিডিক গুণাগুণ মাছের নরম ও পাতলা কাঁটাকে প্রাকৃতিকভাবেই নরম বা গলিয়ে দিতে সাহায্য করে। গলায় কাঁটা বিঁধলে একটি টাটকা পাতিলেবুর রস সরাসরি মুখে নিয়ে চিপে রসটুকু গলার ভেতর কিছুক্ষণ ধরে রেখে আস্তে আস্তে গিলে ফেলুন। এটি কাঁটার ধারালো ভাব কমিয়ে সেটিকে সহজেই নিচে নামিয়ে দিতে সাহায্য করবে।

গলায় মাছের কাঁটা বিঁধলে তা বের করার ১০টি সহজ উপায়।
গলায় মাছের কাঁটা বিঁধলে তা বের করার ১০টি সহজ উপায়।

৬. অ্যাপল সাইডার ভিনেগারের সঠিক ব্যবহার (ACV)

লেবুর রসের মতোই অ্যাপল সাইডার ভিনেগারও (Apple Cider Vinegar) তীব্র এসিডিক প্রকৃতির যা ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ মাছের কাঁটাকে নরম করতে অত্যন্ত কার্যকরী। ১ গ্লাস সাধারণ পানিতে এক থেকে দুই চামচ অ্যাপল সাইডার ভিনেগার মিশিয়ে পাতলা (Dilute) করে নিন। এবার এই পানিটি খুব ধীরে ধীরে চায়ের মতো করে আলতো চুমুক দিয়ে পান করুন। এটি গলার কষা ভাব দূর করতে দ্রুত কাজ করে। তবে ভুলেও এটি পানি ছাড়া সরাসরি কাঁচা পান করবেন না।

৭. পাউরুটি ও পানির কম্বিনেশন থেরাপি

এক টুকরো সাধারণ নরম পাউরুটি বা ব্রেড (Bread) নিন। এবার পাউরুটিটি সামান্য পানি বা দুধে এক সেকেন্ডের জন্য চুবিয়ে হালকা ভিজিয়ে নিন। ভেজানো পাউরুটিটি হাত দিয়ে গোল করে একটি ছোট বলের মতো বানিয়ে চিবানো ছাড়াই এক টানে গিলে ফেলুন। ভেজানো পাউরুটির স্পঞ্জের মতো আঠালো গঠন গলার কাঁটাটিকে খুব সহজে নিজের সাথে গেঁথে বা চুষে নিয়ে পাকস্থলীর ভেতরের দিকে চলে যায়।

৮. কার্বোনেটেড ওয়াডার বা সোডা ওয়াটারের ঝটপট ব্যবহার

গলার বন্ধ দশা বা আটকে থাকা কাঁটা দূর করতে এক গ্লাস কার্বোনেটেড ওয়াটার, ক্লাব সোডা বা সাধারণ চিনি ছাড়া স্প্রাইট/সোডা ড্রিংকস পান করতে পারেন। সোডা পানির ভেতরের কার্বনেশন ও গ্যাসের বুদবুদগুলো যখন গলার আস্তরণে আঘাত করে, তখন তা আটকে থাকা কাঁটার চারপাশে একটি প্রাকৃতিক প্রেশার বা চাপ তৈরি করে। এই গ্যাসের চাপে অনেক সময় কাঁটাটি জরায়ু বা খাদ্যনালীর দেয়াল থেকে আলগা হয়ে নিমিষেই নিচে নেমে যায়।

৯. নরম চকোলেট বা মারশমেলো গিলে খাওয়া

বাচ্চাদের গলায় মাছের কাঁটা বিঁধলে তারা ভাতের মণ্ড বা লেবুর রস খেতে তীব্র আপত্তি জানায়। এর চমৎকার ও নিরাপদ বিকল্প হলো নরম চকোলেট বা মারশমেলো (Marshmallows)। ২-৩টি নরম মারশমেলো বা নরম চকোলেট মুখে নিয়ে সামান্য চিবাতে বলুন যাতে এটি আঠালো ও থকথকে হয়, এরপর এক টানে গিলে ফেলতে বলুন। এর আঠালো দেয়াল কাঁটাটিকে টেনে নিচে নামিয়ে দেবে এবং বাচ্চার মুখের স্বাদ ও মেজাজ দুই-ই ভালো রাখবে।

১০. একনাগাড়ে প্রচুর পানি পান করা

অনেক সময় মাছের কাঁটা আসলে গলার মাংসের গভীরে বিঁধে থাকে না, এটি স্রেফ গলার উপরিভাগের লালায় হালকাভাবে আটকে থাকে। এই সাধারণ ক্ষেত্রে অন্য কোনো জটিল পদ্ধতি ব্যবহার না করে একনাগাড়ে বড় বড় চুমুক দিয়ে ১ থেকে ২ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করুন। পানির এই প্রাকৃতিক স্রোত ও তরল ধাক্কা হালকাভাবে আটকে থাকা সাধারণ কাঁটাকে খুব সহজেই ধুয়ে পাকস্থলীর এসিডের ভেতর নিয়ে চলে যায়।

চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)

এই আর্টিকেলে উল্লেখিত ঘরোয়া ফার্স্ট এইড ও প্রাকৃতিক উপায়গুলো সাধারণ এবং প্রাথমিক স্তরের নরম ও ছোট মাছের কাঁটা (Minor Fish Bone Injury) গলার কোনো ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদে নিচে নামিয়ে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও কার্যকরী। তবে মনে রাখবেন, গর্ভাবস্থায়, শিশুদের ক্ষেত্রে এবং বড় কোনো চিতল, বোয়াল বা পাঙাশ মাছের শক্ত ও বড় কাঁটার ক্ষেত্রে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যদি ঘরোয়া উপায়েও গলার কাঁটাটি ২ ঘণ্টার মধ্যে বিন্দুমাত্র না কমে, ঢোক গিলতে গিয়ে অনবরত রক্তপাত (Bleeding) হতে দেখা যায়, গলার ভেতরের তীব্র ব্যথার কারণে বাচ্চার মুখ থেকে অনবরত লালা ঝরতে থাকে, শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট বা দম আটকে আসে, কিংবা রোগীর গায়ের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি উচ্চ জ্বর আসে—তবে বিষয়টিকে এক সেকেন্ডের জন্যও ঘরে বসে অবহেলা করবেন না। এটি খাদ্যনালী ফুটো হয়ে যাওয়া (Esophageal Perforation) বা গভীর ইনফেকশনের লক্ষণ হতে পারে। অবিলম্বে কোনো কবিরাজী বা হাতুড়ে চিকিৎসার পেছনে সময় নষ্ট না করে রোগীকে নিকটস্থ কোনো হাসপাতালের ইএনটি (ENT - নাক, কান, গলা) বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান এবং সঠিক প্রফেশনাল ল্যারিঙ্গোস্কোপি চিকিৎসার মাধ্যমে কাঁটাটি নিরাপদে বের করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।

মন্তব্য করুন

আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।

পাঠকদের মন্তব্য

মোস্তফা কামাল

রুই মাছ খেতে গিয়ে কাঁটা বিঁধেছিল। পাকা কলা গিলে কাজ হলো! এই উপায়টা সত্যিই কাজ করে।

মোকা

ফাতেমা খাতুন

অলিভ অয়েল খেয়ে কাঁটা পিছলে নেমে গেছে। আগে শুকনো ভাত গিলতাম, এখন জানি সেটা ভুল।

ফাখা

জাহিদ হাসান

বাচ্চাকে মারশমেলো খাওয়াতে বলেছিলাম, কাঁটা চলে এসেছে। বাচ্চাদের জন্য দারুণ উপায়।

জাহা