দৈনন্দিন স্বাস্থ্য ও সাধারণ ব্যাধি

মুখের ঘা হলে ঘরে কীভাবে যত্ন নেবেন

ব্লগ এডমিন

মেডিকেল কনটেন্ট রাইটার

মেডিকেল প্যানেল দ্বারা সত্যায়িত
৪ মিনিট পড়ার সময়

মুখের ভেতরে ছোট, গোল বা ডিম্বাকার, ব্যথাযুক্ত ঘা অনেকেরই হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক থেকে দুই সপ্তাহে নিজে থেকে সেরে যায়। সাধারণ মুখের আলসার সাধারণত ঠোঁটের ভেতর, গালের ভেতর বা জিহ্বায় হয়; ঠোঁটের বাইরের ফোসকা বা গুচ্ছ ফোসকা ঠান্ডাজনিত হারপিস হতে পারে, যা একই সমস্যা নয় এবং ছোঁয়াচে হতে পারে।

গাল কামড়ে যাওয়া, ধারালো দাঁত বা ডেনচারের ঘষা, গরম খাবারে পোড়া, কিছু খাবারে জ্বালা, মানসিক চাপ, কিছু ওষুধ বা পুষ্টির ঘাটতি ঘায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অধিকাংশ ছোট ঘা গুরুতর নয়, তবে বড়, বারবার হওয়া বা না-সারা ঘায়ের কারণ যাচাই দরকার। ঘরের যত্ন ব্যথা কমাতে পারে, রোগ নির্ণয় বা দীর্ঘস্থায়ী ঘায়ের চিকিৎসার বিকল্প নয়।

মুখে ঘা হওয়ার প্রধান কারণসমূহ

সব ঘায়ের কারণ এক নয়। সাধারণ কিছু কারণ হলো:

  • গাল বা জিহ্বায় কামড় লাগা কিংবা ধারালো দাঁত/ডেনচারের ঘর্ষণ।
  • ঝাল, টক বা খুব গরম খাবারে জ্বালা।
  • মানসিক চাপ বা অসুস্থতার সময়।
  • কিছু ওষুধ বা অন্য স্বাস্থ্যসমস্যা।

মুখের ঘায়ে ঘরে যত্ন নেওয়ার ৮টি উপায়

পরিচিত ছোট মুখের ঘায়ে নিচের পদক্ষেপগুলো অস্বস্তি কমাতে পারে। উপসর্গ বাড়লে বা অস্বাভাবিক মনে হলে চিকিৎসা নিন।

১. কুসুম গরম লবণ-পানিতে কুলি করুন

এক কাপ কুসুম গরম পানিতে অল্প লবণ গুলে আলতোভাবে কুলি করে ফেলে দিলে মুখ পরিষ্কার রাখতে ও অস্বস্তি সাময়িক কমাতে পারে। দ্রবণ গিলে ফেলবেন না এবং কুলি শেষে পরিষ্কার পানি দিয়ে আবার ধোয়ার প্রয়োজন নেই। মুখে কাটা বা জ্বালা বাড়লে বন্ধ করুন। শিশু বা যে ব্যক্তি নিরাপদে কুলি করে ফেলে দিতে পারে না, তাকে এ পদ্ধতি করাবেন না—গিলে ফেললে বা শ্বাসনালিতে গেলে সমস্যা হতে পারে। কুলি ঘা সারানোর নিশ্চয়তা নয়; বেশি ব্যথা, জ্বর বা দীর্ঘস্থায়ী ঘায়ে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

২. জ্বালা বাড়ায় এমন খাবার সাময়িকভাবে কমান

ঝাল, খুব টক, নোনতা, শক্ত বা খসখসে খাবার ঘায়ে ঘষা লাগিয়ে ব্যথা বাড়াতে পারে। নরম ভাত, ডাল, দই বা অন্য সহনীয় খাবার এবং ঠান্ডা বা কুসুম গরম পানীয় বেছে নিন; খুব গরম খাবার বা পানীয় এড়িয়ে চলুন। ছোট কামড় নিয়ে ধীরে খেলে খেতে সুবিধা হতে পারে। সব খাবার বাদ দেওয়া বা কেবল তরল খাওয়ার দরকার নেই—যা জ্বালা বাড়ায় সেটি সাময়িক বদলান এবং সুষম খাবার চালিয়ে যান। ঘায়ের কারণে পান করা বা খাওয়া কঠিন হলে, বিশেষ করে শিশু বা বয়স্কের ক্ষেত্রে, পানিশূন্যতার লক্ষণ লক্ষ্য করুন এবং চিকিৎসা নিন।

৩. নরম ব্রাশে দাঁত পরিষ্কার করুন

নরম ব্রিসলের ব্রাশ দিয়ে আলতোভাবে দাঁত ও মাড়ি পরিষ্কার রাখুন। ঘায়ের ওপর সরাসরি ঘষবেন না; সম্ভব হলে ছোট মাথার ব্রাশ ব্যবহার করুন। মুখ পরিষ্কার রাখা খাবারের অবশিষ্টাংশ জমতে কমায়, কিন্তু ব্রাশ দিয়ে ঘা ঘষে তোলার চেষ্টা করলে ক্ষত আরও ব্যথা করতে পারে। ধারালো দাঁত, ভাঙা ফিলিং, ব্রেস বা ডেনচারের ঘষা একই জায়গায় ঘা তৈরি করলে ডেন্টিস্টের কাছে কারণটি ঠিক করান। ডেনচার ঠিকমতো না বসলে নিজে ঘষে বা কাটাছেঁড়া করে পরিবর্তন করবেন না।

মুখের ঘায়ে আলতো যত্নের উপকরণ
নরম খাবার ও মুখ পরিষ্কার রাখা অস্বস্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

৪. ব্যথার পণ্যে ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন

ব্যথা বেশি হলে ফার্মাসিস্ট মুখের ঘায়ের জন্য উপযোগী জেল, মাউথওয়াশ বা অন্য পণ্যের বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন। বয়স, গর্ভাবস্থা, অ্যালার্জি, অন্য রোগ ও চলতি ওষুধের কথা জানান এবং লেবেলের নির্দেশ মেনে ব্যবহার করুন। কিছু পণ্য সাময়িকভাবে ব্যথা কমালেও মূল কারণের চিকিৎসা নাও হতে পারে। শিশুর মুখে অবশকারী পণ্য ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা দরকার; নিজে থেকে প্রাপ্তবয়স্কদের পণ্য লাগাবেন না। ব্যথার কারণে পানি বা খাবার নিতে না পারা, কিংবা উপসর্গ বাড়লে শুধু জেল ব্যবহার করে অপেক্ষা করবেন না।

৫. মুখের শুষ্কতা ও তামাক এড়িয়ে চলুন

মুখ শুকিয়ে গেলে ঘায়ে টান বা অস্বস্তি বেশি লাগতে পারে। তৃষ্ণা অনুযায়ী পানি পান করুন এবং ধূমপান, তামাক বা মুখে জ্বালা করে এমন পণ্য এড়িয়ে চলুন। ঠান্ডা পানীয় ছোট চুমুকে নেওয়া কারও কারও জন্য আরামদায়ক হতে পারে। পানি পান করা ঘায়ের চিকিৎসা নয়; হৃদ্‌ বা কিডনি রোগে তরল সীমা থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশ মানুন। মুখ দীর্ঘদিন শুকনো থাকলে, মুখের ভেতরে অন্য পরিবর্তন বা নতুন ওষুধ শুরু হওয়ার পর সমস্যা হলে চিকিৎসক বা ডেন্টিস্টকে জানান।

৬. বারবার হলে সম্ভাব্য কারণের নোট রাখুন

ঘা কত দিন থাকে, কোথায় হয়, খাবার বা মুখে আঘাতের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না, নতুন ওষুধ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব লিখে রাখুন। বারবার হওয়া ঘা কখনও পুষ্টির ঘাটতি, ওষুধ বা অন্য স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে; চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে পরীক্ষা করতে পারেন। নিজে থেকে আয়রন, ভিটামিন বা অন্য সাপ্লিমেন্ট শুরু করবেন না—ঘা হলেই পুষ্টির ঘাটতি আছে এমন নয়। একই জায়গায় বারবার ঘা, একাধিক ঘা, শরীরের অন্য জায়গায় ঘা বা জয়েন্টে ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন নিন।

৭. অ্যান্টিবায়োটিক বা ঘরোয়া রাসায়নিক ব্যবহার করবেন না

সাধারণ মুখের আলসার সবসময় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নয়; তাই চিকিৎসক না বললে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না। একইভাবে স্টেরয়েড বা অবশকারী জেলও সবার জন্য উপযুক্ত নয়। ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্ষতে ওষুধ প্রয়োগ করবেন না। অ্যালকোহল, ঘন হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, অ্যাসপিরিন গুঁড়া, লেবুর রস বা অজানা ভেষজ সরাসরি লাগালে জ্বালা বা টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে। ব্যথা কমানোর নামে পোড়া বা জ্বালা লাগানো কোনো পদার্থ ব্যবহার করবেন না।

৮. না সারলে বা বদলে গেলে পরীক্ষা করান

সাধারণ ছোট ঘা সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহে সেরে যায়। দুই থেকে তিন সপ্তাহেও না সারলে, স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হলে, একই জায়গায় বারবার হলে, রক্তপাত বা বাড়তে থাকা ব্যথা থাকলে ডেন্টিস্ট বা চিকিৎসকের মূল্যায়ন নিন। স্থায়ী ঘার কারণ দেখে প্রয়োজন হলে পরীক্ষা বা চিকিৎসা করা যায়। জ্বর, ত্বক বা যৌনাঙ্গেও ঘা, চোখে ব্যথা/লালভাব, গিলতে অসুবিধা, মুখে গাঁট, অকারণ ওজন কমা বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে আরও আগে পরামর্শ নিন। ঠোঁটের বাইরের গুচ্ছ ফোসকা হলে সেটিকে সাধারণ মুখের আলসার ধরে একই যত্নে সীমাবদ্ধ থাকবেন না।

যে খাবার ও অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলা ভালো

ঘা থাকা অবস্থায় জ্বালা বাড়ায় এমন বিষয় কমান:

  • ঝাল, টক, খুব নোনতা ও শক্ত খাবার।
  • তামাক ও ধূমপান।
  • ঘায়ে সরাসরি অজানা ভেষজ, তেল বা রাসায়নিক লাগানো।
  • নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড নেওয়া।

তথ্যসূত্র (References)

  1. 01NHS: Mouth ulcers
  2. 02Mayo Clinic: Canker sore: Symptoms and causes

চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)

এই তথ্য সাধারণ মুখের ঘায়ে স্ব-যত্নের জন্য। দুই থেকে তিন সপ্তাহেও না সারা, অস্বাভাবিক বড় বা খুব ব্যথাযুক্ত ঘা, বারবার ফিরে আসা, মুখে গাঁট, অকারণ ওজন কমা, গিলতে কষ্ট, জ্বর, শরীরের অন্য জায়গায় ঘা বা রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম থাকলে ডেন্টিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। খাওয়া-পান করা কঠিন হলে, দ্রুত অবনতি বা গুরুতর পানিশূন্যতা হলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন

আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।

পাঠকদের মন্তব্য