‘লো প্রেশার’ বলতে সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে কম রক্তচাপ বোঝালেও, একটি সংখ্যাই সবার অবস্থা নির্ধারণ করে না। কারও রক্তচাপ তুলনামূলক কম থেকেও কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। আবার মাথা ঘোরা, ঝাপসা দেখা, দুর্বলতা বা অজ্ঞান হওয়ার ভাব পানিশূন্যতা, হঠাৎ উঠে দাঁড়ানো, ওষুধ, রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার কারণেও হতে পারে।
হালকা মাথা ঘোরায় প্রথম লক্ষ্য পড়ে যাওয়া ঠেকানো এবং উপসর্গের কারণ খেয়াল করা—নিজে থেকে রক্তচাপ বাড়ানোর চেষ্টা নয়। নিচের পদক্ষেপগুলো নিরাপদে বসে বা শুয়ে পরিস্থিতি সামলাতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু কারণ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। অজ্ঞান হওয়া, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি বা রক্তক্ষরণের লক্ষণে ঘরোয়া ‘লবণ-পানি’ ব্যবহার না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
মাথা ঘোরা বা চাপ কমার সম্ভাব্য কারণ
কারণ নির্ণয়ের জন্য উপসর্গের প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ।
- পানিশূন্যতা—বিশেষত বমি, ডায়রিয়া বা গরমে ঘামের পর।
- হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ কমে যাওয়া।
- কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
- রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ বা হৃদ্সমস্যাসহ অন্য গুরুতর কারণ।
নিরাপদ প্রাথমিক করণীয়
তীব্র অসুস্থতা বা অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে এগুলো জরুরি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
১. আগে পড়ে যাওয়া এড়ান
মাথা ঘুরলে সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ুন বা নিরাপদে শুয়ে পড়ুন; দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করলে পড়ে গিয়ে আঘাত লাগতে পারে। সিঁড়ি, রান্নার আগুন, গোসলখানা বা গাড়ি চালানো এ সময় এড়িয়ে চলুন। একা থাকলে কাছের কাউকে জানান এবং পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হঠাৎ উঠে কাজ শুরু করবেন না। অজ্ঞান হয়ে গেলে ব্যক্তি দ্রুত সাড়া দিচ্ছেন কি না দেখুন এবং শ্বাস স্বাভাবিক কি না খেয়াল করুন। অচেতন বা ঝিমিয়ে থাকা ব্যক্তিকে পানি, খাবার বা ওষুধ মুখে দেবেন না—শ্বাসনালিতে ঢুকে যেতে পারে। দ্রুত জরুরি সহায়তা নিন, বিশেষত শ্বাস অস্বাভাবিক, আঘাত বা বুকব্যথা থাকলে।
২. ধীরে ভঙ্গি বদলান
শোয়া থেকে বসা, তারপর দাঁড়ানোর আগে কয়েক মুহূর্ত থামুন। বিছানা থেকে উঠলে আগে পাশে বসুন, পা মেঝেতে রেখে মাথা ঘোরে কি না দেখুন; স্থির লাগলে সহায়তা নিয়ে দাঁড়ান। বসা বা দাঁড়ানোর পর উপসর্গ শুরু হওয়া কখনও অবস্থান বদলের সঙ্গে রক্তচাপ কমার ইঙ্গিত হতে পারে। এতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে, কিন্তু বারবার এমন হলে কেবল ধীরে ওঠা যথেষ্ট নয়। উপসর্গ কতক্ষণ থাকে, কোন ভঙ্গিতে হয় এবং নতুন ওষুধ শুরু হয়েছে কি না লিখে চিকিৎসককে জানান।
৩. পানিশূন্যতা থাকলে তরল নিন
গরমে অতিরিক্ত ঘাম, জ্বর, বমি বা পাতলা পায়খানার পর তরল ঘাটতি মাথা ঘোরা বাড়াতে পারে। সচেতন থাকলে এবং বমি না হলে অল্প অল্প করে পানি বা পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত ওরাল রিহাইড্রেশন দ্রবণ পান করুন। বমি বা ডায়রিয়ায় তরল-লবণের ঘাটতি হলে ORS সহায়ক হতে পারে; সাধারণ মাথা ঘোরায় এটি সবার প্রয়োজন হয় না। কিডনি, হৃদ্যন্ত্র বা লিভারের রোগে তরলের সীমা থাকলে নিজের চিকিৎসা-নির্দেশ মানুন। অজ্ঞান, বিভ্রান্ত বা বারবার বমি করা ব্যক্তিকে মুখে তরল দেবেন না। পানি রাখতে না পারা, প্রস্রাব খুব কমে যাওয়া বা দুর্বলতা বাড়লে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

৪. খাবার না খেয়ে থাকলে হালকা কিছু খান
অনেকক্ষণ না খেলে ক্ষুধা, দুর্বলতা বা কাঁপুনি লাগতে পারে; এই অনুভূতিকে সবসময় নিম্ন রক্তচাপ বলা যায় না। সচেতন অবস্থায় খাবার খেতে পারলে স্বাভাবিক হালকা খাবার নিন এবং উপসর্গ কমে কি না লক্ষ্য করুন। নিয়মিত ছোট খাবার কিছু মানুষের অবস্থান বদলের পর অস্বস্তিতেও সহায়ক হতে পারে, তবে প্রত্যেকের জন্য একই খাদ্যসূচি নয়। ডায়াবেটিস থাকলে ঘাম, কাঁপুনি, বিভ্রান্তি বা দুর্বলতা রক্তে শর্করা কমার লক্ষণও হতে পারে। সম্ভব হলে নিজের চিকিৎসা পরিকল্পনা মেনে শর্করা পরীক্ষা করুন; বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া বা গিলতে অক্ষমতায় মুখে খাবার দেবেন না এবং জরুরি সহায়তা নিন।
৫. অতিরিক্ত লবণকে সাধারণ সমাধান ভাববেন না
নিজে থেকে লবণ-পানি পান করা বা খাবারে লবণ বাড়ানো মাথা ঘোরার নির্ভরযোগ্য ঘরোয়া চিকিৎসা নয়। অতিরিক্ত সোডিয়াম উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির অসুখে ক্ষতিকর হতে পারে এবং উপসর্গের প্রকৃত কারণ নির্ণয়েও দেরি ঘটাতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় চিকিৎসক তরল বা লবণ গ্রহণের ব্যক্তিগত পরামর্শ দিতে পারেন; তা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। তাই চিকিৎসক না বললে নিয়মিত লবণ-পানি, লবণের বড়ি বা ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করবেন না।
৬. ওষুধের তালিকা চিকিৎসকের সঙ্গে পর্যালোচনা করুন
কিছু রক্তচাপের ওষুধ, মূত্রবর্ধকসহ বিভিন্ন ওষুধে দাঁড়ালে মাথা ঘোরা বা রক্তচাপ কমার প্রবণতা হতে পারে। সম্প্রতি নতুন ওষুধ শুরু, মাত্রা বদল বা অসুস্থতার পর উপসর্গ দেখা দিলে ওষুধের নাম, সময় ও উপসর্গের সম্পর্ক লিখে প্রেসক্রাইবারকে জানান। ওষুধ নিজে বন্ধ বা মাত্রা কমাবেন না; হঠাৎ বন্ধ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। চিকিৎসক প্রয়োজনে রক্তচাপ বসা ও দাঁড়ানো অবস্থায় মাপবেন, অন্য কারণ বিবেচনা করবেন এবং ওষুধ পরিবর্তন দরকার কি না ঠিক করবেন।
৭. উপসর্গ ও রিডিং নোট করুন
রক্তচাপ মাপলে আগে কয়েক মিনিট চুপচাপ বসুন, পিঠ ঠেকিয়ে ও পা মেঝেতে রাখুন, হাতটি হৃৎপিণ্ডের সমতলে রাখুন এবং কাফের মাপ ঠিক আছে কি না দেখুন। সম্ভব হলে একই সময়ে একাধিক রিডিং নিয়ে তারিখ-সময় লিখুন; মাপার আগে ব্যায়াম, ধূমপান বা ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা সঠিক রিডিংয়ে সহায়তা করে। একটি কম রিডিং বা ঘরের যন্ত্রের ভুল মাপ দিয়ে নিজে রোগ নির্ণয় করবেন না। রিডিংয়ের সঙ্গে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া, খাবার, জ্বর-বমি-ডায়রিয়া ও ওষুধের সময় নোট করে চিকিৎসকের কাছে নিন। উপসর্গ না থাকলে কেবল কম সংখ্যার জন্য নিজে চিকিৎসা শুরু করবেন না।
৮. জরুরি লক্ষণ চিনুন
অজ্ঞান হওয়া, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, ঠান্ডা-ঘামযুক্ত ত্বক, তীব্র দুর্বলতা, কালো বা রক্তমিশ্রিত পায়খানা, বেশি রক্তপাত, গুরুতর পানিশূন্যতা বা আঘাতের পর মাথা ঘোরা হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। এগুলো শক, রক্তক্ষরণ বা হৃদ্যন্ত্র-সংক্রান্ত সমস্যাসহ গুরুতর অবস্থার লক্ষণ হতে পারে। মাথা ঘোরা দ্রুত না কমলে, বারবার হলে, নতুন ওষুধের পর শুরু হলে বা গর্ভাবস্থায় দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস বা হৃদ্/কিডনি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে অপেক্ষা না করে যোগাযোগ করুন।
যে বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
নিজের অবস্থা বা সহ-রোগের কথা না ভেবে সাধারণ পরামর্শ প্রয়োগ করা নিরাপদ নয়।
- নিজে থেকে নিয়মিত লবণ-পানি খাওয়া।
- নির্ধারিত ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করা।
- মাথা ঘুরলেও দ্রুত উঠে দাঁড়ানো বা গাড়ি চালানো।
- অজ্ঞান হওয়া বা বুকব্যথাকে ঘরোয়া উপায়ে সামলাতে চেষ্টা করা।
তথ্যসূত্র (References)
চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)
বারবার মাথা ঘোরা, ঝাপসা দেখা বা অজ্ঞান হওয়ার ভাবকে শুধু ‘লো প্রেশার’ ধরে নেবেন না। অজ্ঞান হওয়া, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, ঠান্ডা-ঘামযুক্ত ত্বক, রক্তপাত বা তীব্র দুর্বলতায় জরুরি চিকিৎসা নিন। গর্ভাবস্থা, ডায়াবেটিস, হৃদ্ বা কিডনি রোগ, বয়স্ক বয়স এবং রক্তচাপের ওষুধ চললে দ্রুত ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শ নিন। নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ বা লবণ বাড়াবেন না।
মন্তব্য করুন
আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।
