পাইলস বা হেমোরয়েডস হলো মলদ্বার ও মলাশয়ের নিচের অংশের ফুলে যাওয়া রক্তনালি। ভেতরের পাইলসে মলত্যাগের পর উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা যেতে পারে, আর বাইরের পাইলসে চুলকানি, ব্যথা বা মলদ্বারের পাশে কোমল গুটি হতে পারে। তবে এসব লক্ষণ পাইলস ছাড়াও অন্য সমস্যায় হয়—বিশেষ করে রক্তপাতকে পরীক্ষা ছাড়া পাইলস ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কোষ্ঠকাঠিন্য, মলত্যাগে চাপ দেওয়া বা দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা উপসর্গ বাড়াতে পারে। মল নরম রাখা ও জায়গাটি আলতোভাবে পরিষ্কার রাখার অভ্যাস কিছু মানুষের অস্বস্তি কমায়, কিন্তু সব পাইলস সারায় না এবং অন্য রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। নতুন, স্থায়ী বা বাড়তে থাকা উপসর্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
পাইলসের উপসর্গ বাড়ার সাধারণ কারণসমূহ
পাইলসের সুনির্দিষ্ট কারণ সবসময় বোঝা যায় না; কিছু অভ্যাস ও অবস্থা মলদ্বারের রক্তনালিতে চাপ বাড়াতে পারে:
- কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত মল বা মলত্যাগের সময় বারবার চাপ দেওয়া।
- দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বা মলত্যাগে অনিয়ম।
- গর্ভাবস্থা, বয়স বাড়া বা দীর্ঘস্থায়ী কাশি—কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এগুলো ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- আঁশ কম থাকা খাদ্যাভ্যাস এবং ভারী জিনিস তোলার সময় অতিরিক্ত চাপ।
- মলদ্বারে রক্ত, ব্যথা বা গুটি পাইলস ছাড়াও অন্ত্রের অন্য সমস্যায় হতে পারে; লক্ষণকে নিজে রোগনির্ণয় হিসেবে ধরবেন না।
পাইলসের উপসর্গে ঘরে যত্ন নেওয়ার ৭টি উপায়
মল নরম রাখা ও জ্বালা কমানোর অভ্যাসে কিছুটা আরাম মিলতে পারে; নতুন বা গুরুতর উপসর্গে চিকিৎসা নিন।
১. আঁশ ধীরে ধীরে বাড়িয়ে মল নরম রাখুন
শাকসবজি, ফল, ডাল, ছোলা, মটর, ওটস বা অন্য পূর্ণশস্যের মতো আঁশযুক্ত খাবার নিয়মিত রাখুন। আঁশ মলের পরিমাণ ও নরমভাব বাড়াতে সহায়তা করে, ফলে মলত্যাগে অতিরিক্ত চাপ কমতে পারে। আগে আঁশ কম খেলে হঠাৎ অনেক বাড়ানোর বদলে কয়েক দিন ধরে ধীরে বাড়ান; দ্রুত পরিবর্তনে গ্যাস বা পেট ফাঁপা হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য তরল আঁশকে কাজ করতে সহায়তা করে, তবে সবার প্রয়োজন এক নয়। হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির অসুখে তরল সীমিত রাখতে বলা থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশ মানুন। খাদ্য থেকে আঁশ বাড়ানো কঠিন হলে ফাইবার সাপ্লিমেন্ট বা মল নরম করার ওষুধের বিষয়ে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞেস করুন; দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটব্যথা থাকলে নিজে থেকে নিয়মিত ওষুধ শুরু করবেন না।
২. মলত্যাগের স্বাভাবিক বেগ অনুসরণ করুন
বেগ হলে অযথা চেপে রাখবেন না; দেরি করলে মল আরও শক্ত হতে পারে। টয়লেটে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে সময় দিন, কিন্তু জোরে চাপ দেবেন না এবং প্রয়োজনের বেশি বসে থাকবেন না। ফোন বা বই নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এড়িয়ে চললে চাপ দেওয়ার সময় কমে। মলত্যাগ না হলে উঠে পরে আবার চেষ্টা করুন—বারবার জোর করা উপসর্গ বাড়াতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট ভঙ্গি সবার জন্য প্রয়োজন নয়; আরামদায়কভাবে বসুন ও শরীরকে সময় দিন। বারবার শক্ত মল, মলত্যাগের অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন বা পেটব্যথা হলে শুধু টয়লেটের অভ্যাস বদলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
৩. কুসুম গরম পানিতে বসে সাময়িক আরাম নিন
পরিষ্কার পাত্রে আরামদায়ক কুসুম গরম পানিতে অল্প সময় বসলে চুলকানি বা ব্যথায় সাময়িক স্বস্তি পেতে পারেন। পানি খুব গরম যেন না হয়; সংবেদনশীল ত্বকে তাপমাত্রা আগে হাতে যাচাই করুন। পরে পরিষ্কার নরম কাপড় দিয়ে ঘষা ছাড়াই আলতো করে শুকিয়ে নিন। এটি আরাম দেওয়ার উপায়, পাইলসের কারণ দূর করার চিকিৎসা নয়। পানিতে লবণ, সুগন্ধি, জীবাণুনাশক বা অন্য ঘরোয়া উপাদান মেশানোর প্রয়োজন নেই—এগুলো জ্বালা বাড়াতে পারে। বসার পর ব্যথা বাড়লে বা ত্বকে জ্বালা হলে বন্ধ করুন।

৪. মলদ্বারের চারপাশ আলতোভাবে পরিষ্কার রাখুন
মলত্যাগের পর পানি দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করুন এবং জায়গাটি শুকনো রাখতে নরম কাপড় দিয়ে চাপ দিয়ে পানি শুষে নিন; ঘষাঘষি করলে ত্বকের জ্বালা বাড়তে পারে। সুগন্ধিযুক্ত ওয়াইপ, কড়া সাবান, স্প্রে বা ডুচ ব্যবহার না করাই ভালো। অন্ত্রের ভেতর কোনো কিছু প্রবেশ করিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করবেন না। পরিচ্ছন্নতা অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু পাইলস সারায় না। বারবার মিউকাস বা পুঁজ বের হওয়া, ত্বক লাল-গরম হওয়া, জ্বর বা বাড়তে থাকা ব্যথা হলে সংক্রমণসহ অন্য কারণ যাচাইয়ের জন্য চিকিৎসা নিন।
৫. নিয়মিত নড়াচড়া করুন ও চাপের কারণ খেয়াল করুন
হাঁটা বা দৈনন্দিন হালকা নড়াচড়া অন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ ও কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে মাঝে মাঝে উঠে চলাফেরা করুন। ভারী জিনিস তুলতে হলে শ্বাস আটকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া এড়িয়ে চলুন; কাজের সময় ব্যথা বাড়লে বিরতি নিন। ব্যায়াম পাইলসের সরাসরি চিকিৎসা নয় এবং তীব্র ব্যথা বা রক্তপাতের সময় জোর করে ব্যায়াম করা উচিত নয়। গর্ভাবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা থাকলে উপসর্গ বাড়ার কারণ ও উপযোগী নড়াচড়া নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করুন।
৬. ক্রিম বা মল নরম করার পণ্যে পরামর্শ নিন
ব্যথা, চুলকানি বা ফোলায় কিছু ফার্মেসির ক্রিম, সাপোজিটরি বা কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ সাময়িক উপকার দিতে পারে। আপনার উপসর্গ ও অন্য ওষুধ বিবেচনায় কোন পণ্য নিরাপদ এবং কত দিন ব্যবহার করবেন তা ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের কাছে জেনে নিন; পণ্যের লেবেলের নির্দেশ মানুন। এ ধরনের পণ্য মূল কারণের চিকিৎসা নাও হতে পারে। এক সপ্তাহের মতো ব্যবহারে আরাম না হলে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা র্যাশ হলে, কিংবা বারবার প্রয়োজন হলে নিজে থেকে চালিয়ে না গিয়ে পরামর্শ নিন। গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান, শিশু বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আগে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন।
৭. রক্তপাত বা উপসর্গের পরিবর্তন নথিবদ্ধ করুন
কখন ব্যথা বা রক্ত দেখা যায়, রক্তের পরিমাণ ও রং, মলের ধরন, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ব্যবহৃত ওষুধের তথ্য লিখে রাখুন। এ বিবরণ চিকিৎসককে কারণ বুঝতে সাহায্য করতে পারে। প্রথমবার মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত, বারবার রক্তপাত, বা পাইলসের পরিচিত উপসর্গ বদলে গেলে পরীক্ষা করানো জরুরি—রক্ত উজ্জ্বল লাল হলেও সবসময় পাইলস থেকে আসে না। তীব্র বা অবিরাম রক্তপাত, রক্তের জমাট, কালো আলকাতরার মতো মল, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞানভাব হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। জ্বর, পুঁজ, তীব্র ব্যথা, অকারণ ওজন কমা বা মলত্যাগের অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন থাকলেও চিকিৎসকের মূল্যায়ন দরকার।
যে অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলা ভালো
উপসর্গ বাড়ানো ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া—দুটিই এড়াতে:
- মলত্যাগের সময় জোর করা, বেগ চেপে রাখা বা দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা।
- রক্তপাতকে নিশ্চিতভাবে পাইলস ধরে নেওয়া; প্রথমবার বা বারবার হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
- মলদ্বারে রসুন, ভিনেগার, সুগন্ধি, কড়া সাবান বা অজানা মলম লাগানো—এসব জ্বালা বা ক্ষতি করতে পারে।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ক্রিম, সাপোজিটরি, জোলাপ বা অন্য ওষুধ ব্যবহার।
- তীব্র ব্যথা, প্রচুর রক্তপাত, কালো মল, জ্বর বা পুঁজকে ঘরোয়া যত্নে সামলানোর চেষ্টা।
তথ্যসূত্র (References)
চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)
এই তথ্য পাইলস-সদৃশ পরিচিত উপসর্গে স্ব-যত্নের জন্য; রক্তপাতের কারণ নির্ণয় করে না। প্রথমবার বা বারবার রক্তপাত, কালো/গাঢ় মল, প্রচুর বা বন্ধ না হওয়া রক্তপাত, রক্তের জমাট, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া, তীব্র ব্যথা, জ্বর বা পুঁজ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। উপসর্গ বাড়লে, ঘরোয়া যত্নে না কমলে, মলত্যাগের অভ্যাস বদলালে বা অকারণ ওজন কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। গর্ভাবস্থা, রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ানো ওষুধ ব্যবহার বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
মন্তব্য করুন
আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।
