গলাব্যথা একটি উপসর্গ; টনসিলের প্রদাহ বা টনসিলাইটিস হলো গলার দুই পাশে থাকা টনসিল ফুলে ও ব্যথা হওয়া। একটির সঙ্গে অন্যটি থাকতে পারে, তবে সব গলাব্যথা টনসিলের সংক্রমণ নয়। সর্দি-কাশির মতো ভাইরাস, কখনও ব্যাকটেরিয়া, আবার ধোঁয়া বা শুষ্ক বাতাসেও গলা অস্বস্তিকর হতে পারে। সাদা দাগ, জ্বর বা গলার চেহারা দেখে একা কারণ নিশ্চিত করা যায় না।
হালকা উপসর্গে বিশ্রাম, আরামদায়ক তরল ও নরম খাবার সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। এগুলো ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ সারায় না এবং শ্বাস বা গিলতে সমস্যা হলে ঘরোয়া যত্নের জন্য অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়।
টনসিলের ব্যথা বা গলাব্যথার সাধারণ কারণসমূহ
গলার ব্যথা নানা কারণে হয়; লক্ষণ মিললেও পরীক্ষা ছাড়া সবসময় কারণ আলাদা করা যায় না:
- সর্দি-কাশি বা ফ্লুর মতো ভাইরাস টনসিল ফুলিয়ে দিতে পারে; কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া বা কণ্ঠ ভাঙা ভাইরাসের পক্ষে ইঙ্গিত হলেও নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
- স্ট্রেপসহ কিছু ব্যাকটেরিয়া টনসিল বা গলায় সংক্রমণ ঘটাতে পারে। জ্বর, গিলতে ব্যথা বা সাদা দাগ থাকতে পারে, তবে এগুলো একা ব্যাকটেরিয়া নিশ্চিত করে না।
- ধোঁয়া, শুষ্ক বাতাস, অ্যালার্জি বা নাকের সর্দি গলায় পড়লেও ব্যথা বা খুসখুস হতে পারে; সব ক্ষেত্রেই সংক্রমণ থাকে না।
- টনসিলের প্রদাহ সাধারণত কয়েক দিনে কমতে পারে, কিন্তু তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও পুনরাবৃত্তি অনুযায়ী চিকিৎসা মূল্যায়ন দরকার হতে পারে।
টনসিলের ব্যথা ও গলাব্যথায় ঘরে যত্নের ৭টি উপায়
শ্বাস ও গিলতে সমস্যা নেই এমন হালকা গলাব্যথায় নিচের পদক্ষেপগুলো সাময়িক আরাম দিতে পারে; অবনতি হলে চিকিৎসা নিন।
১. বিশ্রাম নিন ও আরামদায়ক তরল পান করুন
শরীর খারাপ থাকলে বিশ্রাম নিন এবং পানি, স্যুপ বা আপনার গলায় আরাম দেয় এমন ঠান্ডা কিংবা কুসুম গরম পানীয় পান করুন। তাপমাত্রা পছন্দভেদে বদলায়; কোনো নির্দিষ্ট পানীয় সংক্রমণ সারায় না, তবে গলা আর্দ্র রাখা ও তরল গ্রহণ সহজ করতে পারে। একবারে বেশি পান করতে কষ্ট হলে অল্প অল্প করে বারবার চেষ্টা করুন। খুব গরম পানীয় গলা জ্বালাতে পারে। হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির রোগে তরল সীমিত রাখার নির্দেশ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মানুন। তরল গিলতেই না পারা, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা মাথা ঘোরার মতো পানিশূন্যতার লক্ষণ হলে ঘরে অপেক্ষা না করে চিকিৎসা নিন।
২. নিরাপদভাবে গার্গল করুন
যে ব্যক্তি গার্গল করে পানি ফেলে দিতে পারেন, তিনি কুসুম গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে গার্গল করলে কারও কারও গলার অস্বস্তি সাময়িক কমতে পারে। গার্গল শেষে পানি থুতু ফেলে দিন; এটি জীবাণু নির্মূল করে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ছোট শিশু, গার্গল করে থুতু ফেলতে পারেন না এমন ব্যক্তি, অথবা গিলতে বা শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে এমন ব্যক্তি এ পদ্ধতি করবেন না। অসুবিধা, কাশি বা বমিভাব হলে বন্ধ করুন। গার্গল চিকিৎসা মূল্যায়নের বিকল্প নয়, বিশেষ করে জ্বর বেশি বা অবস্থা খারাপ হলে।
৩. নরম ও সহনীয় খাবার বেছে নিন
গিলতে ব্যথা হলে নরম ভাত, স্যুপ, দই বা অন্য পরিচিত নরম খাবার এবং ঠান্ডা পানীয় চেষ্টা করতে পারেন। ছোট কামড় ও ধীরে খাওয়া আরামদায়ক হতে পারে। খুব গরম, ঝাল, শক্ত বা খসখসে খাবার গলায় ঘষা লাগিয়ে অস্বস্তি বাড়ালে সাময়িক এড়িয়ে চলুন। ক্ষুধা কম থাকলে জোর করে খাবার দেবেন না, তবে তরল গ্রহণ বজায় রাখার চেষ্টা করুন। কোনো বিশেষ খাবার টনসিলের সংক্রমণ দূর করে না। শিশু বা অসুস্থ ব্যক্তি খাওয়া-পান করা কমিয়ে দিলে প্রস্রাব, মুখের শুষ্কতা, দুর্বলতা ও আচরণের পরিবর্তন খেয়াল করুন; পানিশূন্যতার আশঙ্কা হলে চিকিৎসা নিন।

৪. ব্যথার ওষুধের বিষয়ে পরামর্শ নিন
ব্যথা বা জ্বরের ওষুধ কিছু ক্ষেত্রে অস্বস্তি কমাতে পারে, কিন্তু ওষুধের উপযোগিতা বয়স, গর্ভাবস্থা, অ্যালার্জি, অন্য রোগ এবং চলতি ওষুধের ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলে উপযুক্ত ওষুধ বেছে নিন এবং প্যাকেট বা প্রেসক্রিপশনের নির্দেশ মেনে চলুন। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কের ওষুধ বা মাত্রা দেবেন না। গর্ভবতী ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি রোগী বা একাধিক ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তি আগে পরামর্শ নিন। ব্যথা কমলেও শ্বাসকষ্ট, গিলতে না পারা বা অবনতি হলে চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না।
৫. ধোঁয়া ও গলার উত্তেজক এড়িয়ে চলুন
ধূমপান, পরোক্ষ ধোঁয়া ও ধুলাবালি গলার জ্বালা বাড়াতে পারে। অসুস্থ অবস্থায় ধোঁয়ামুক্ত, বাতাস চলাচল করে এমন ঘরে থাকুন এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। এ পদক্ষেপ বিরক্তি কমাতে পারে, কিন্তু সংক্রমণের কারণের চিকিৎসা নয়। অতিরিক্ত গরম বাষ্প মুখের কাছে নেওয়া বা গরম পানির পাত্রে ঝুঁকে থাকা এড়িয়ে চলুন—এতে আরাম নিশ্চিত নয়, বরং পোড়ার ঝুঁকি থাকে। তীব্র গন্ধ বা ধোঁয়ায় উপসর্গ বাড়লে সেগুলো থেকেও দূরে থাকুন।
৬. অ্যান্টিবায়োটিক নিজে থেকে নেবেন না
অনেক টনসিলের প্রদাহ ও গলাব্যথা ভাইরাসজনিত; এসব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, যেমন স্ট্রেপ, সন্দেহ হলে উপসর্গ ও পরীক্ষা বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। গলার সাদা দাগ দেখেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন বলে ধরে নেওয়া যায় না। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটাতে এবং জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধ বাড়াতে পারে। চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিলে ঠিক যেভাবে বলেছেন সেভাবে নিন; নিজে থেকে অন্যের ওষুধ, পুরোনো প্রেসক্রিপশন বা অসম্পূর্ণ কোর্স ব্যবহার করবেন না।
৭. ছড়ানো কমান ও উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করুন
যে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া গলাব্যথা ঘটায় তার অনেকগুলোই কাছাকাছি সংস্পর্শ, কাশি-হাঁচির কণা বা দূষিত হাত-জিনিসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। হাত ধুয়ে নিন, কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢাকুন, অসুস্থ অবস্থায় কাপ, চামচ বা খাবার ভাগ করে খাবেন না। জ্বর থাকলে বা খুব অসুস্থ লাগলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ ও জনসমাগম কমান। কখন ব্যথা শুরু হয়েছে, জ্বর, কাশি, পানীয় গ্রহণ এবং নতুন কোনো লক্ষণ হচ্ছে কি না লক্ষ্য করুন। এক সপ্তাহেও না কমলে, বারবার ফিরে এলে বা দৈনন্দিন খাওয়া-পানিতে বাধা দিলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন নিন। শিশু, বয়স্ক, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, ক্যানসারের চিকিৎসাধীন বা গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে আগে পরামর্শ নেওয়া ভালো।
যে বিষয়গুলো এড়িয়ে চলা ভালো
সাময়িক আরামের চেষ্টা যেন নিরাপদ মূল্যায়ন বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে না দেয়:
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু, ভাগাভাগি বা পুরোনো ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
- সাদা দাগ বা গলার চেহারা দেখে নিজে রোগ নির্ণয় করবেন না; ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার চিকিৎসা এক নয়।
- অত্যন্ত গরম পানীয়, ঝাল বা শক্ত খাবার এবং গলার জ্বালা বাড়ায় এমন ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন।
- ছোট শিশুকে লবণ-পানির গার্গল করতে দেবেন না যদি সে নিরাপদে গার্গল করে থুতু ফেলতে না পারে।
- অসুস্থ অবস্থায় কাপ, চামচ বা খাবার ভাগ করবেন না; হাত ধোয়া ও কাশি-হাঁচি ঢেকে রাখা অবহেলা করবেন না।
- শ্বাস, গিলতে পারা, লালা সামলানো বা পানিশূন্যতার সমস্যাকে ঘরোয়া উপায়ে সামলানোর চেষ্টা করবেন না।
তথ্যসূত্র (References)
চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)
এই তথ্য সাধারণ ও হালকা গলাব্যথায় স্ব-যত্নের জন্য; গুরুতর ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের চিকিৎসা নয়। শ্বাস নিতে কষ্ট, লালা গিলতে না পারা বা মুখ দিয়ে লালা পড়া, পানি গিলতে না পারা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, মুখ খুলতে অসুবিধা, ঘাড় ফুলে যাওয়া, এক পাশে দ্রুত বাড়তে থাকা তীব্র ব্যথা বা ফোলা, কণ্ঠ বদলে যাওয়া, কিংবা দ্রুত অবনতি হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। উচ্চ জ্বরসহ খুব অসুস্থ লাগা, র্যাশ, দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার সংক্রমণেও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসা নেওয়ার সীমা কম রাখুন।
মন্তব্য করুন
আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।
