সিজারের পর কোমর বা পিঠে অস্বস্তি হতে পারে, তবে এর একটিমাত্র কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। গর্ভাবস্থার ভঙ্গিগত পরিবর্তন, পেট ও পেলভিক ফ্লোরের পেশির পুনরুদ্ধার, শিশুকে কোলে নেওয়া বা খাওয়ানোর সময়ের ভঙ্গি, দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থায় থাকা, কম নড়াচড়া, পেশিতে টান এবং ঘুমের ঘাটতি—সবই ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু ব্যথা দেখে নির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা যায় না। স্পাইনাল বা এপিডুরাল অ্যানেস্থেশিয়াকেই দীর্ঘস্থায়ী কোমরব্যথার নিশ্চিত কারণ বলা যায় না।
সেরে ওঠার গতি ব্যক্তি অনুযায়ী আলাদা। ক্ষত ও শরীরের পুনরুদ্ধারের জন্য চিকিৎসক বা ধাত্রীর নির্দেশনা মেনে ধীরে দৈনন্দিন কাজে ফিরুন; জোর করে ব্যথা সহ্য করে চালিয়ে যাবেন না।
ব্যথার একাধিক সম্ভাব্য অবদান থাকতে পারে
প্রসবের পর কোমর-পিঠের অস্বস্তির পেছনে একাধিক বিষয় থাকতে পারে; কেবল উপসর্গ দেখে কারণ নিশ্চিত করা যায় না।
- গর্ভাবস্থার ভঙ্গিগত পরিবর্তন, পেট ও পেলভিক ফ্লোরের পেশির পুনরুদ্ধার, পেশিতে টান, কম নড়াচড়া বা দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকা ভূমিকা রাখতে পারে।
- শিশুকে খাওয়ানো, কোলে নেওয়া ও বহন করার ভঙ্গি, ঘুমের ঘাটতি এবং প্রসব-পরবর্তী দৈনন্দিন চাপও অস্বস্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। স্পাইনাল বা এপিডুরাল অ্যানেস্থেশিয়াকে নিশ্চিত কারণ ধরে নেওয়া উচিত নয়।
সিজারের পর কোমর-পিঠের ব্যথায় সহায়ক যত্ন
আরামের উপায় সবার ক্ষেত্রে এক নয়। ক্ষত সেরে ওঠা ও চিকিৎসকের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধীরে এগোন; ব্যথা বাড়লে থামুন।
১. অল্প অল্প করে নড়াচড়া বাড়ান
শরীর অনুমতি দিলে এবং চিকিৎসকের নির্দেশনার সঙ্গে মিল রেখে ঘরের ভেতর অল্প হাঁটা দিয়ে শুরু করুন। একটানা শুয়ে বা বসে না থেকে আরামমতো অবস্থান বদলান। হাঁটায় ব্যথা বাড়লে থামুন, বিশ্রাম নিন এবং প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন। স্বাভাবিক কাজ বা ব্যায়ামে ফেরার সময় সবার এক নয়।
২. শিশুকে খাওয়ানোর সময় শরীরকে ভর দিন
খাওয়ানোর সময় পিঠে ভর দেওয়ার মতো চেয়ার বেছে নিন। পায়ের নিচে ছোট পিঁড়ি এবং কোলে বালিশ রাখলে শিশুকে নিজের কাছে আনা যায়; শিশুর দিকে বারবার ঝুঁকতে হয় না। কাঁধ ঢিলে রাখুন, পিঠে আরামদায়ক সমর্থন দিন এবং ব্যথা বাড়লে ভঙ্গি বদলান বা বিরতি নিন। যে ভঙ্গিতে আপনার ও শিশুর আরাম হয় সেটিই বেছে নিন।
৩. শিশুকে তোলার সময় কাছাকাছি রাখুন
তোলার আগে শিশুর কাছে এগিয়ে যান, কোমর মোচড়ানো এড়িয়ে চলুন এবং প্রয়োজন হলে হাঁটু ভাঁজ করে ধীরে উঠুন। প্রথম দিকের পুনরুদ্ধারে শিশুর চেয়ে ভারী কিছু তোলা বা ঘরের ভারী কাজ করার আগে চিকিৎসক বা ধাত্রীর নির্দেশ নিন। সম্ভব হলে কাছের কারও সাহায্য নিন। ব্যথা বাড়লে কাজ থামান—নিজেকে চাপ দিয়ে চালিয়ে যাবেন না।
৪. দীর্ঘক্ষণ অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে থাকবেন না
শিশুর যত্নে বসা, দাঁড়ানো বা শোয়ার ভঙ্গি দীর্ঘক্ষণ একই থাকলে পেশিতে টান লাগতে পারে। সুযোগমতো অবস্থান পাল্টান, জিনিসপত্র হাতের নাগালে রাখুন এবং শিশুকে তুলতে বা নামাতে নিরাপদ সহায়তা নিন। ব্যথা সামলাতে শরীরকে জোর করে সোজা করা বা অস্বস্তিকর ভঙ্গি ধরে রাখা জরুরি নয়।

৫. বিশ্রাম ও কাজের গতি নিজের মতো ঠিক করুন
নবজাতকের যত্নে বিশ্রাম পাওয়া কঠিন হতে পারে; তাই সম্ভব হলে শিশুর ঘুমের সময়ে বিশ্রাম নিন বা পরিবারের কারও সহায়তা নিন। কাজকে ছোট ভাগে করুন এবং মাঝে বিরতি রাখুন। কোমর বা পেটে চাপ পড়ে এমন ব্যায়াম, দ্রুত ব্যায়ামে ফেরা বা ব্যথা উপেক্ষা করে কাজ চালানো এড়িয়ে চলুন। নিজের আরামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজের পরিমাণ বাড়ান; কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আগের মতো হয়ে উঠতেই হবে—এমন চাপ নেবেন না।
৬. আরামের ব্যবস্থা নিরাপদ রাখুন
যে ভঙ্গিতে বিশ্রাম নিলে আরাম হয় সেটি বেছে নিন; কাত হয়ে শুলে হাঁটুর মাঝে বালিশ রাখতে পারেন। গরম বা ঠান্ডা সেঁক কিছু মানুষের আরাম দিতে পারে, তবে ত্বক ও অপারেশনের ক্ষত থেকে দূরে রাখুন, কাপড়ে মুড়ে ব্যবহার করুন এবং খুব গরম কিছু সরাসরি লাগাবেন না। ক্ষতে চাপ দেবেন না। সেঁক ব্যথার কারণ সারায়—এমন নিশ্চয়তা নেই।
৭. ব্যথা থাকলে চিকিৎসা-পরামর্শ নিন
ব্যথা কয়েক সপ্তাহেও না কমলে, ক্রমে বাড়লে, ঘুম বা দৈনন্দিন কাজ আটকে দিলে, অথবা বারবার ফিরে এলে চিকিৎসক, ধাত্রী বা ফিজিওথেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে উপযুক্ত পুনর্বাসন বা ফিজিওথেরাপির পরামর্শ দেওয়া যায়। ব্যথার ওষুধের উপযোগিতা প্রসব-পরবর্তী অবস্থা, স্তন্যদান ও অন্য ওষুধের ওপর নির্ভর করতে পারে; চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে যাচাই করুন। নিজের থেকে ওষুধ শুরু বা নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করবেন না।
৮. বিপদের লক্ষণ চিনে দ্রুত সহায়তা নিন
জ্বর বা খুব অসুস্থ লাগা, সিজারের ক্ষত লাল-ফোলা হওয়া, পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের হওয়া, প্রস্রাবে ব্যথা, প্রচুর রক্তপাত, কিংবা হঠাৎ বা বাড়তে থাকা তীব্র পিঠব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। দুই পায়ে দুর্বলতা বা অবশভাব, হাঁটতে অসুবিধা, যৌনাঙ্গের আশপাশে অনুভূতি কমে যাওয়া, প্রস্রাব-পায়খানা ধরে রাখতে না পারা বা গুরুতর আঘাতের পর ব্যথা হলে জরুরি বিভাগে যান। পায়ের পিণ্ডলিতে ব্যথা-ফোলা বা শ্বাসকষ্ট হলেও দ্রুত চিকিৎসা জরুরি। প্রসবের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তীব্র মাথাব্যথার সঙ্গে ঝাপসা দেখা বা স্নায়বিক সমস্যা হলে এখনই চিকিৎসা নিন।
যা এড়িয়ে চলবেন
অপারেশনের পরের আরোগ্যকে সময় দিন এবং শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দিন।
- চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া ভারী জিনিস তোলা, জোরে পেটের ব্যায়াম, তীব্র স্ট্রেচ বা দ্রুত কঠিন ব্যায়ামে ফেরা এড়িয়ে চলুন।
- মেরুদণ্ডে জোরে চাপ বা ম্যানিপুলেশন, ব্যথার জায়গায় গভীর মালিশ, সিজারের ক্ষতে চাপ, তেল-ভেষজ দিয়ে নিরাময়ের দাবি, অথবা ব্যথা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়া নিরাপদ সমাধান নয়।
তথ্যসূত্র (References)
চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)
এই পরামর্শ সাধারণ তথ্যের জন্য; সিজারের পরের পরিচর্যা ও কাজে ফেরার নির্দেশ আপনার চিকিৎসক বা ধাত্রীর কাছ থেকে নিন। জ্বর, ক্ষতের পরিবর্তন, তীব্র ব্যথা বা স্নায়ুজনিত লক্ষণ হলে ঘরোয়া যত্নে অপেক্ষা করবেন না।
মন্তব্য করুন
আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।
