মা, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্য

গর্ভাবস্থায় কোমর ও পিঠের ব্যথা: নিরাপদ যত্ন ও সতর্কতা

ব্লগ এডমিন

মেডিকেল কনটেন্ট রাইটার

মেডিকেল প্যানেল দ্বারা সত্যায়িত
৩ মিনিট পড়ার সময়

গর্ভাবস্থায় কোমর, পিঠের নিচের অংশ বা শ্রোণির আশপাশে ব্যথা ও টান লাগা অনেকেরই হয়। শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে পিঠ ও শ্রোণির জোড়ায় চাপ পড়তে পারে; দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকা বা দৈনন্দিন কাজেও অস্বস্তি বাড়তে পারে। সাধারণ পেশি-জোড়ার ব্যথা সাধারণত নড়াচড়া বা ভঙ্গির সঙ্গে বদলায় এবং বিশ্রাম বা ভঙ্গি পাল্টালে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। তবে শুধু ব্যথার ধরন দেখে কারণ নিশ্চিত করা যায় না, আর সব ব্যথাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়াও ঠিক নয়।

ব্যথা সামলাতে জোর করে শরীর চেপে ধরা, মেরুদণ্ড মটকানো বা তেল-মলমকে চিকিৎসা ভাবার প্রয়োজন নেই। আরামদায়ক ভঙ্গি, নিয়মিত অবস্থান বদল, সহনীয় নড়াচড়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের মূল্যায়নই নিরাপদ শুরু। ব্যথা নতুন, তীব্র, বাড়তে থাকা বা দৈনন্দিন কাজ সীমিত করলে আপনার প্রসূতি চিকিৎসক বা ধাত্রীর সঙ্গে কথা বলুন।

গর্ভাবস্থায় কোমর ও পিঠের ব্যথায় সহায়ক যত্ন

এসব পদক্ষেপ আরাম ও দৈনন্দিন চলাফেরায় সহায়তা করতে পারে, তবে ব্যথার কারণ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

১. একই ভঙ্গিতে বেশিক্ষণ থাকবেন না

একটানা বসে, দাঁড়িয়ে বা ঝুঁকে কাজ করলে কোমর-পিঠে অস্বস্তি বাড়তে পারে। কাজের ফাঁকে নিয়মিত ভঙ্গি বদলান, অল্প হাঁটুন বা আরামদায়কভাবে দাঁড়ান। দীর্ঘক্ষণ বসতে হলে পিঠ ঠেকিয়ে বসুন এবং পায়ের তলা মেঝেতে রাখুন। বিরতি নেওয়া মানে সারাদিন শুয়ে থাকা নয়; শরীর যতটা স্বচ্ছন্দ বোধ করে, ততটাই স্বাভাবিক দৈনন্দিন নড়াচড়া বজায় রাখুন।

২. বসা ও দাঁড়ানোর সময় পিঠকে আরাম দিন

বসার সময় পিঠের নিচে ভাঁজ করা ছোট কুশন বা তোয়ালে দিলে আরাম হতে পারে। কাঁধ ঢিলে রাখুন, পা মেঝেতে রাখুন এবং শরীরকে জোর করে এক ভঙ্গিতে সোজা করে রাখবেন না। দাঁড়ানোর সময় দুই পায়ে ভর ভাগ করুন। কাজের জিনিস হাতের নাগালে রাখুন, যাতে বারবার সামনে ঝুঁকতে না হয়। অস্বস্তি বাড়লে ভঙ্গি বদলান বা একটু বিরতি নিন।

৩. নিরাপদভাবে জিনিস তুলুন ও ঘোরাফেরা করুন

ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন; প্রয়োজন হলে সাহায্য নিন। হালকা কিছু তুলতে হলে হাঁটু ভাঁজ করে নিচু হন, পিঠ আরামদায়কভাবে সোজা রাখুন এবং জিনিসটি শরীরের কাছে ধরে উঠুন। হাতে বোঝা নিয়ে কোমর মোচড়াবেন না—পা ঘুরিয়ে দিক বদলান। কাজের সময় ব্যথা বাড়লে বিরতি নিন বা কাজের ভঙ্গি বদলান; ব্যথা সহ্য করে চালিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।

৪. আরামদায়ক ও সহায়ক জুতো বেছে নিন

হাঁটা বা দাঁড়ানোর সময় পায়ে আরাম লাগে এমন স্থিতিশীল জুতো পরুন। পা ফুলে গেলে আঁটসাঁট জুতো অস্বস্তি বাড়াতে পারে, তাই মাপ ও আরাম খেয়াল করুন। উঁচু হিল পরলে ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হলে তা এড়িয়ে চলুন; তবে কোনো জুতোকেই ব্যথা সারানোর উপায় ভাববেন না। আরামদায়ক জুতো দৈনন্দিন চলাফেরাকে সহজ করতে পারে, কিন্তু ব্যথার কারণ নির্ণয় করে না।

গর্ভাবস্থায় কোমর ও পিঠের ব্যথায় সহায়ক যত্ন।
গর্ভাবস্থায় কোমর ও পিঠের ব্যথায় নিরাপদ যত্ন ও সতর্কতা।

৫. ঘুমের সময় বালিশ দিয়ে ভর দিন

যে ভঙ্গিতে শুলে স্বস্তি পান, সেটি বেছে নিন। কাত হয়ে শুলে হাঁটুর মাঝখানে এবং প্রয়োজনে পেটের পাশে বালিশ রাখলে শরীরকে আরামদায়ক ভর দেওয়া যায়। বালিশের সংখ্যা বা বিশেষ প্রসূতি-বালিশ সবার জন্য জরুরি নয়; যেটি আরাম দেয় সেটিই ব্যবহার করুন। রাতে ঘুম ভেঙে অস্বস্তি হলে ধীরে পাশ ফিরুন। ব্যথায় ঘুম ব্যাহত হলে চিকিৎসককে জানান।

৬. গর্ভাবস্থার উপযোগী নড়াচড়া বজায় রাখুন

জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় চিকিৎসক নিষেধ না করলে হাঁটা বা পরিচিত হালকা কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে পারেন। নতুন ব্যায়াম শুরু বা আগের ব্যায়াম বদলানোর আগে প্রসূতি-সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলুন, বিশেষত আগে থেকে কোনো জটিলতা থাকলে। কোমর-পিঠের কোমল নড়াচড়া বা প্রসারণ ব্যথা না বাড়ালে ধীরে করতে পারেন; ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অসুস্থ লাগলে থামুন। জোর করে টান দেওয়া বা ব্যথার মধ্যে ব্যায়াম নয়।

৭. ব্যথা থাকলে মূল্যায়ন ও ফিজিওথেরাপির সহায়তা নিন

ব্যথা কয়েক দিনেও না কমলে, বারবার হলে, বাড়তে থাকলে বা হাঁটা-ঘুম-দৈনন্দিন কাজে বাধা দিলে আপনার প্রসূতি চিকিৎসক বা ধাত্রীকে জানান। প্রয়োজন হলে তিনি গর্ভাবস্থার জন্য উপযুক্ত ফিজিওথেরাপি বা ব্যায়ামের পরামর্শ দিতে পারেন। মেরুদণ্ডে জোরে চাপ, মটকানো বা টান দিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করবেন না। ব্যথার ওষুধের নিরাপত্তা গর্ভাবস্থায় বদলে যায়—কিছু নেওয়ার আগে চিকিৎসক, ধাত্রী বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে যাচাই করুন; আগে থেকে দেওয়া ওষুধ নিজে বন্ধ করবেন না।

ব্যথা বাড়াতে পারে এমন কাজ এড়িয়ে চলুন

  • ব্যথা বাড়ে এমন ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ থাকা, ভারী বোঝা তোলা বা কোমর মোচড়ানো এড়িয়ে চলুন। জিনিস তুলতে হলে হাঁটু ভাঁজ করুন, আর ভারী হলে সাহায্য নিন।
  • জোরে মালিশ, মেরুদণ্ড মটকানো বা টান দিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করবেন না। অতিরিক্ত গরম সেঁক, ভেষজ তেল বা মলমকে চিকিৎসা ভাববেন না। নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে যাচাই করুন।

চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)

সাধারণ পেশি-জোড়ার অস্বস্তি গর্ভাবস্থায় হতে পারে, কিন্তু নিচের লক্ষণগুলো থাকলে অপেক্ষা না করে প্রসূতি চিকিৎসক, ধাত্রী বা মাতৃত্বকেন্দ্রে দ্রুত যোগাযোগ করুন: ব্যথা তীব্র বা দ্রুত বাড়া, জ্বর, প্রস্রাবে জ্বালা বা অন্য সমস্যা, পাঁজরের নিচে পাশের দিকে ব্যথা, যোনিপথে রক্তপাত বা পানি পড়া, কিংবা নিয়মিত ব্যথাযুক্ত সংকোচন। দুর্বলতা বা অবশভাব, হাঁটতে অসুবিধা, পা বা নিতম্বের অনুভূতি হারানো, অথবা প্রস্রাব-পায়খানা ধরে রাখতে না পারলে জরুরি চিকিৎসা নিন। বড় আঘাত বা তীব্র পেট/শ্রোণির ব্যথার পরও দ্রুত মূল্যায়ন দরকার। লক্ষণ না থাকলেও ব্যথা স্থায়ী বা কাজকর্মে বাধা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

মন্তব্য করুন

আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।

পাঠকদের মন্তব্য