গর্ভাবস্থার শুরুতে শরীরের অনুভূতি একেকজনের একেক রকম। ক্লান্তি, স্তনে পরিবর্তন বা বমিভাব গর্ভাবস্থায় হতে পারে, কিন্তু এগুলো মাসিকের আগের পরিবর্তন বা অন্য কারণেও হয়—শুধু লক্ষণ দিয়ে গর্ভধারণ নিশ্চিত করা যায় না। আবার কারও শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। সন্দেহ হলে উপসর্গের চেয়ে সঠিক সময়ে করা গর্ভধারণ পরীক্ষা বেশি নির্ভরযোগ্য।
“গর্ভাবস্থার প্রথম সপ্তাহ” কথাটিও বিভ্রান্তিকর হতে পারে। চিকিৎসায় গর্ভকাল সাধারণত শেষ মাসিকের প্রথম দিন থেকে গণনা করা হয়; ফলে ওই প্রথম সপ্তাহে অনেকের গর্ভধারণই হয়নি। মাসিক দেরি হলে বা গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকলে পরীক্ষার সময় ও ফল বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নিন। সম্ভাব্য গর্ভাবস্থায় ব্যথা বা রক্তপাতকে নিজে থেকে স্বাভাবিক ধরে নেবেন না।
শুরুর দিকের সম্ভাব্য লক্ষণ ও করণীয়
নিচের পরিবর্তনগুলো গর্ভাবস্থার শুরুতে কারও কারও হতে পারে, তবে কোনোটিই একা গর্ভধারণ নিশ্চিত করে না।
১. হালকা রক্তপাত বা দাগ
অল্প দাগ বা রক্তপাতের কারণ নানা রকম; এর রং, পরিমাণ বা সময় দেখে গর্ভধারণ নিশ্চিত করা যায় না। মাসিকের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে সেটিও গর্ভধারণের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে, তবে একে একা প্রমাণ বলা যায় না। অসুস্থতা, মানসিক চাপ বা অন্য কারণেও মাসিক দেরি হতে পারে। মাসিকের তারিখ ও চক্রের স্বাভাবিক ধরন মনে রাখুন; চক্র অনিয়মিত হলে নির্ধারিত তারিখ অনুমান করা কঠিন হতে পারে।
২. তলপেটে মৃদু টান বা ব্যথা
কখনও হালকা টান বা অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু তা গর্ভধারণের নির্ভরযোগ্য লক্ষণ নয় এবং কারণও নানারকম হতে পারে। ব্যথা বাড়লে, এক পাশে তীব্র হলে বা রক্তপাতের সঙ্গে হলে অপেক্ষা করে দেখবেন না। সম্ভাব্য গর্ভাবস্থায় এ ধরনের উপসর্গের দ্রুত চিকিৎসা-পরামর্শ প্রয়োজন; পরীক্ষা পজিটিভ না হলেও মূল্যায়ন জরুরি হতে পারে। বিশেষত ব্যথা হঠাৎ তীব্র হলে বা দুর্বলতা/মাথা ঘোরা যোগ হলে কাছের জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে যান।
৩. স্তনে সংবেদনশীলতা বা ভারী লাগা
স্তনে টান, স্পর্শে অস্বস্তি বা ভারী ভাব শুরুতে হতে পারে, আবার মাসিকের আগেও এমন হয়। কারও এই পরিবর্তন হয় না। তাই স্তনের অনুভূতি দিয়ে গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করা বা গর্ভাবস্থা নেই বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। লক্ষণগুলো কতটা হবে বা কখন শুরু হবে, তা দিয়ে গর্ভাবস্থার সুস্থতা বিচার করা যায় না।
৪. ক্লান্তি
স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্লান্তি কারও কারও হয়, তবে ঘুমের অভাব, রক্তস্বল্পতা, অসুস্থতা বা দৈনন্দিন চাপেও ক্লান্ত লাগতে পারে। বিশ্রাম নিন, পানি পান করুন এবং উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র হলে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন। ক্লান্তি একা গর্ভধারণের প্রমাণ নয়।

৫. বমিভাব বা বমি
বমিভাব দিনের যেকোনো সময়ে হতে পারে, তবে সবার হয় না এবং এটি গর্ভাবস্থার জন্য নির্দিষ্টও নয়। খাবার বা গন্ধে অস্বস্তি থাকলে সহনীয়ভাবে খান; বারবার বমি হয়ে পানি রাখতে না পারলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বমিভাব না থাকা গর্ভাবস্থা নেই—এমন প্রমাণ নয়। একইভাবে, বমিভাব থাকলেও পরীক্ষার আগে গর্ভধারণ নিশ্চিত বলা যায় না।
৬. প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন
ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ গর্ভাবস্থায় দেখা দিতে পারে, কিন্তু পানি পান, মূত্রনালির সংক্রমণসহ অন্য কারণেও হতে পারে। প্রস্রাবে জ্বালা, জ্বর বা ব্যথা থাকলে চিকিৎসা নিন। কেবল প্রস্রাবের পরিবর্তনের ভিত্তিতে গর্ভধারণ ধরে নেওয়া যাবে না। উপসর্গের ধরন লিখে রাখলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা সহজ হয়; তবে লক্ষণ পর্যবেক্ষণ পরীক্ষা বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।
৭. শরীরের তাপমাত্রা ও পরীক্ষা
শরীরের তাপমাত্রা বা গরম লাগা দিয়ে গর্ভধারণ শনাক্ত করা যায় না; এ ধরনের পরিবর্তনের অন্য কারণও থাকতে পারে। অল্প দাগ বা রক্তপাতের কারণ বিভিন্ন হতে পারে; দেখে একে “ইমপ্লান্টেশন” বলা বা গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করা যায় না। রক্তপাতকে সবসময় স্বাভাবিকও ধরে নেওয়া ঠিক নয়। গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকলে রক্তপাতের বিষয়ে চিকিৎসা-পরামর্শ নিন। তীব্র বা বাড়তে থাকা তলপেটের ব্যথা—বিশেষত এক পাশে—কাঁধের ডগায় ব্যথা, মাথা খুব ঘোরা, দুর্বল লাগা, অজ্ঞান হওয়া বা বেশি রক্তপাত হলে জরুরি বিভাগে যান। এগুলো জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণসহ জরুরি সমস্যার লক্ষণ হতে পারে; পজিটিভ পরীক্ষা না এলেও অপেক্ষা করবেন না। **পরীক্ষা ও পরবর্তী যত্ন** বেশিরভাগ ঘরোয়া প্রস্রাব পরীক্ষা মাসিক মিস হওয়ার প্রথম দিন থেকে বেশি নির্ভরযোগ্য। পরবর্তী মাসিকের তারিখ জানা না থাকলে অসুরক্ষিত সহবাসের অন্তত ২১ দিন পর পরীক্ষা করুন এবং প্যাকেটের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। খুব তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করলে নেগেটিভ ফলও গর্ভধারণ পুরোপুরি বাদ দেয় না। মাসিক না এলে কয়েক দিন পর আবার পরীক্ষা করুন; দ্বিতীয়বারও নেগেটিভ অথচ মাসিক না এলে বা উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকলে অ্যালকোহল ও ধূমপান এড়িয়ে চলুন। চলতি ওষুধ নিজে বন্ধ করবেন না; নতুন ওষুধ বা ভেষজ নেওয়ার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে সম্ভাব্য গর্ভাবস্থার কথা জানান। কোনো ওষুধ ইতিমধ্যে খেয়ে থাকলে আতঙ্কিত না হয়ে ওষুধের নাম ও সময় লিখে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন। গর্ভধারণের পরিকল্পনায় ফলিক অ্যাসিড বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন। পরীক্ষা পজিটিভ হলে এবং গর্ভাবস্থা চালিয়ে যেতে চাইলে দ্রুত প্রসূতি-সেবা শুরু করার জন্য যোগাযোগ করুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)
উপসর্গ দিয়ে গর্ভধারণ নিশ্চিত করা যায় না এবং ঘরোয়া টোটকা দিয়ে পরীক্ষা বা চিকিৎসার বিকল্প হয় না। সম্ভাব্য গর্ভাবস্থায় ব্যথা বা রক্তপাত হলে চিকিৎসা-পরামর্শ নিন; তীব্র/একপাশের ব্যথা, কাঁধের ডগায় ব্যথা, অজ্ঞান হওয়া, প্রচণ্ড মাথা ঘোরা বা বেশি রক্তপাত জরুরি অবস্থা হতে পারে।
মন্তব্য করুন
আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।
