মা, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্য

থাইরয়েড থাকলে কি সন্তান ধারণে সমস্যা হয়? জেনে নিন

ব্লগ এডমিন

মেডিকেল কনটেন্ট রাইটার

মেডিকেল প্যানেল দ্বারা সত্যায়িত
৩ মিনিট পড়ার সময়

থাইরয়েডের রোগ থাকলেই সন্তান ধারণ অসম্ভব—এমন নয়। তবে থাইরয়েড হরমোন খুব কম বা বেশি থাকলে কারও কারও মাসিক বা ডিম্বস্ফোটনে পরিবর্তন হতে পারে, ফলে গর্ভধারণে সময় লাগতে পারে। এর কারণ ও প্রভাব ব্যক্তিভেদে আলাদা; সঠিক মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা চিকিৎসকের সঙ্গে পরিকল্পনা করা যায়। গর্ভধারণে অসুবিধা হলে সব দায় থাইরয়েডের ওপর দেওয়া ঠিক নয়, কারণ উভয় সঙ্গীর নানা স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে।

থাইরয়েডের সমস্যা মানেই গর্ভধারণে বাধা নয়

থাইরয়েডের কম বা বেশি কার্যকারিতা কিছু মানুষের মাসিক বা ডিম্বস্ফোটনে প্রভাব ফেলতে পারে। সঠিক মূল্যায়ন ছাড়া গর্ভধারণে অসুবিধার কারণ নির্ধারণ করা যায় না।

  • হাইপোথাইরয়েডিজমে শরীর প্রয়োজনের তুলনায় কম থাইরয়েড হরমোন তৈরি করে; হাইপারথাইরয়েডিজমে বেশি তৈরি করে।
  • অনিয়মিত মাসিক বা ডিম্বস্ফোটনের পরিবর্তনের পাশাপাশি উভয় সঙ্গীর অন্য কারণও থাকতে পারে।
  • রক্তপরীক্ষা, চিকিৎসা ও গর্ভাবস্থার পর্যবেক্ষণ ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসক ঠিক করেন।

থাইরয়েড থাকলে গর্ভধারণ: কী জানা ও করণীয়

থাইরয়েড রোগ প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে ফল সবার জন্য এক নয়। লক্ষণ, পরীক্ষা ও গর্ভধারণের পরিকল্পনা একসঙ্গে চিকিৎসকের সঙ্গে পর্যালোচনা করুন:

১. থাইরয়েড গ্রন্থি ও হরমোনের কাজ বুঝুন

গলার সামনের ছোট থাইরয়েড গ্রন্থি এমন হরমোন তৈরি করে, যা শরীরের শক্তি ব্যবহারসহ অনেক কাজকে প্রভাবিত করে। গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করলে তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম, আর বেশি তৈরি করলে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়। দুই অবস্থাই পরীক্ষা করে শনাক্ত করতে হয়; শুধু ক্লান্তি, ওজন বদল বা অন্য একটি লক্ষণ দেখে নিজের রোগ নির্ণয় করা যায় না।

২. লক্ষণ ও মাসিকের পরিবর্তন খেয়াল করুন

হাইপোথাইরয়েডিজমে ক্লান্তি, ঠান্ডা বেশি লাগা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মনোযোগে অসুবিধা বা অনিয়মিত/ভারী মাসিক হতে পারে। হাইপারথাইরয়েডিজমে বুক ধড়ফড়, গরম সহ্য না হওয়া, হাত কাঁপা বা অকারণে ওজন কমার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। কারও লক্ষণ মৃদু বা অস্পষ্টও হতে পারে; আবার একই উপসর্গ অন্য কারণেও হয়। তাই লক্ষণের তালিকা দিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের কাছে উপসর্গ ও কতদিন ধরে হচ্ছে তা জানান। তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তপরীক্ষা—যেমন TSH ও থাইরয়েড হরমোন—করতে পারেন।

৩. মাসিক ও ডিম্বস্ফোটনের সঙ্গে সম্পর্কটি ব্যক্তিভেদে বদলায়

থাইরয়েডের অস্বাভাবিক কার্যকারিতা কখনও মাসিক অনিয়মিত করতে পারে এবং ডিম্বস্ফোটনের ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রত্যেকের এমন হবে না; মাসিকের পরিবর্তন হলেই থাইরয়েড দায়ী—এমনও নয়, আর অনিয়মিত মাসিক একাই বন্ধ্যাত্বের প্রমাণ নয়। PCOS, বয়স, অন্যান্য হরমোন বা স্বাস্থ্যগত কারণও বিবেচনা করা লাগে। চক্রের তারিখ, রক্তপাতের ধরন ও উপসর্গ লিখে রাখলে চিকিৎসককে তথ্য দিতে সুবিধা হয়।

৪. গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে আগেই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন

থাইরয়েডের রোগ জানা থাকলে গর্ভধারণের চেষ্টা শুরুর আগে চিকিৎসক বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের সঙ্গে বর্তমান পরীক্ষা, উপসর্গ ও চিকিৎসা পর্যালোচনা করুন। আগের রিপোর্ট, রোগ কবে ধরা পড়েছে এবং বর্তমানে কী ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নেন—এসব তথ্য সঙ্গে রাখুন। সবার জন্য একটাই TSH লক্ষ্য বা একই পরীক্ষা-সূচি প্রযোজ্য নয়; সিদ্ধান্ত রোগের ধরন ও ব্যক্তিগত ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে গাইনি বা প্রজননস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও সমন্বয় করতে পারেন।

থাইরয়েড ও গর্ভধারণের পরিকল্পনা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা।
থাইরয়েড রোগ ও গর্ভধারণের পরিকল্পনায় চিকিৎসা-পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।

৫. নির্ধারিত ওষুধ নিজে বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না

থাইরয়েডের ওষুধ নির্দিষ্ট রোগ ও পরীক্ষার ফল অনুযায়ী দেওয়া হয়। গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন বা পরীক্ষা ইতিবাচক হয়েছে—এ কথা দ্রুত চিকিৎসককে জানান, কারণ গর্ভাবস্থায় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন বদলাতে পারে। কিন্তু নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ, শুরু বা মাত্রা পরিবর্তন করবেন না। চলতি ওষুধ, ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্টের তালিকা চিকিৎসককে জানান।

৬. গর্ভাবস্থায় পর্যবেক্ষণ ব্যক্তিগতভাবে ঠিক হয়

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের চাহিদা ও পরীক্ষার ব্যাখ্যা বদলাতে পারে। কারও নিয়মিত রক্তপরীক্ষা বা চিকিৎসা সমন্বয় দরকার হয়; কার কতবার পরীক্ষা লাগবে, তা রোগের ধরন ও ফল দেখে চিকিৎসক ঠিক করেন। গর্ভধারণ নিশ্চিত হলে দ্রুত চিকিৎসককে জানালে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা সময়মতো করা যায়। সঠিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে থাইরয়েড রোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকের সুস্থ গর্ভাবস্থা সম্ভব; তবে ফল নিশ্চিত করে বলা যায় না। প্রসূতি ও থাইরয়েড-চিকিৎসা দলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখুন।

৭. খাবার ও ভেষজকে থাইরয়েড চিকিৎসার বিকল্প ভাববেন না

সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি, ঘুম ও সামর্থ্য অনুযায়ী নড়াচড়া সামগ্রিক স্বাস্থ্যে সহায়ক, কিন্তু কোনো খাবার বা ভেষজ থাইরয়েড রোগ সারায় বা গর্ভধারণ নিশ্চিত করে না। নিজে থেকে আয়োডিন, সেলেনিয়াম, হারবাল পণ্য বা “হরমোন ঠিক করার” সাপ্লিমেন্টের নিয়ম শুরু করবেন না। খাবার বা সাপ্লিমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করুন।

৮. গর্ভধারণে দেরি হলে বিস্তৃত মূল্যায়ন নিন

থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গর্ভধারণে দেরির অন্য কারণ থাকতে পারে। প্রয়োজন হলে উভয় সঙ্গীর স্বাস্থ্য-ইতিহাস, মাসিক ও ডিম্বস্ফোটন, ওষুধ এবং পুরুষ সঙ্গীর বীর্য পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করা হয়। নিয়মিত অসুরক্ষিত সহবাসের এক বছর পরও গর্ভধারণ না হলে মূল্যায়নের পরামর্শ নিন; বয়স ৩৬ বা বেশি, মাসিক খুব অনিয়মিত বা আগে থেকেই পরিচিত সমস্যা থাকলে আরও আগে কথা বলুন। মূল্যায়নের ধরন ও সময় ব্যক্তির বয়স, ইতিহাস এবং উপসর্গের ওপর নির্ভর করে। অপেক্ষা বা পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন এবং চিকিৎসকের কাছে প্রশ্ন করতে দ্বিধা করবেন না।

চিকিৎসকের পরামর্শ ও সতর্কবার্তা (Medical Disclaimer)

থাইরয়েড পরীক্ষা, ওষুধ ও গর্ভাবস্থার পর্যবেক্ষণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত। নিজে থেকে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু, বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না। গর্ভধারণে দেরি হলে প্রয়োজনমতো উভয় সঙ্গীর মূল্যায়ন নিন; একে শুধু থাইরয়েড বা নারীর সমস্যা ধরে নেবেন না।

মন্তব্য করুন

আপনার মতামত অন্য পাঠকদের উপকারে আসতে পারে। সব মন্তব্য পর্যালোচনার পর প্রকাশিত হয়।

পাঠকদের মন্তব্য